
সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,
' বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর।'
বিশ্বজুড়ে সব মহৎ কাজে নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান আছে। ভাষা আন্দোলনেও আছে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সমৃদ্ধ ইতিহাস। বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৪৭ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সন্মেলনের একটি ঘোষণাপত্রে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। প্রচার মাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ভাষা ব্যবহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।এতে পূর্ব বাংলার বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেদিন তাৎক্ষনিকভাবে প্রতিবাদ ও বিরোধিতা আসে। তখন থেকে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায়। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন কঠিন রূপ ধারণ করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার ক্ষেত্রে বিতর্ক উঠলে ছাত্রীরা পক্ষে মত দিয়েছে। সেদিন সকাল থেকেই মেয়েরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমতলার সভায় যোগ দিতে আসেন। কিন্তু পুলিশি হামলার আশঙ্কায় ছাত্রীদের মিছিল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ' রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ' দাবির আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিল ছাত্রীরা। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সালাম,জব্বার, রফিক, বরকত, শফিকসহ আরো অনেকেই। পাকিস্তানের আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে মিছিলের সামনের কাতারে ছিলেন নারীরা। ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজা, শোক মিছিল এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি হরতালসহ প্রতিটি কর্মসূচিতে নারীরা অংশগ্রহণ করে একাত্ম ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান লিখে পোস্টার এঁকেছেন। ১৯৫২ সালে নারীরাই ধাক্কাধাক্কি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙে। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে আনে ছাত্রীরা। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে তারা লুকিয়ে রাখে।আন্দোলনের খরচ চালাতে অনেক গৃহিনী নিজেদের অলংকার খুলে দেন৷ ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় অনেক নারীকে সংসার হারাতে হয়েছে, অনেক নারীকে জেল খাটতে হয়েছে। কোন কোন নারীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয় এবং জেলা শহরে নারীদের অগ্রগণ্য ভুমিকা ছিলো চোখে পড়ার মতো। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পাশাপাশি স্কুলের ছাত্রীরা মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল ছিলেন।
বর্তমানের মতন তখন মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ ছিলো না৷ অনেক বাঁধা- বিপত্তিতে তাদের দিনযাপন করতে হতো। রক্ষণশীল পরিবারের মুসলিম মেয়েদের উর্দু ফারসি, আরবি ছাড়া সাধারণ লেখাপড়ার চর্চা তেমন ছিল না। নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই সমগ্র দেশজুড়ে মুসলমান মেয়েদের জাগরণের সাড়া পড়ে। অভিভাবকরাও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠেন। সেইসময়ের প্রেক্ষাপটে গণআন্দোলনে যোগ দেওয়া মেয়েদের জন্য সহজ ব্যাপার ছিল না।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়লেও ছিল নিয়মের কড়াকড়ি। মেয়েরা ছেলেদের সাথে কথা বললেও জরিমানা হত। মেয়েদেরকে তাদের জন্য নির্ধারিত কমন রুমে বসে থাকতে হত।শিক্ষক ক্লাসে ঢোকার আগে মেয়েদের ঢেকে সাথে নিয়ে রুমে ঢুকতেন। ক্লাসে সামনের দিকের বেঞ্চে বসতে হতো মেয়েদের। ক্লাস শেষে শিক্ষকের পিছু পিছু গিয়ে আবার নির্দিষ্ট কমনরুমে বসে থাকতেন।
১৯৪৭-১৯৫১ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ৮০-৮৫ জন। ভাষার জন্য ছেলে-মেয়ে সব একাট্টা হয়েই আন্দোলনে নামেন। এই ছাত্রীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে এককাতারে দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনে গৌরবময় ভূমিকা রেখেছেন। নারীরা কখনো আন্দোলনের সামনে থেকে প্রতিবাদী হয়েছেন। কখনো নিরবে আন্দোলনের সপক্ষে নিজেদের কাজ করে গেছেন। ড. শাফিয়া খাতুন ছিলেন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি পারিবারিক বাঁধা ডিঙিয়ে ছেলেদের সঙ্গে জোর কদমে এগিয়ে গেছেন ভাষা আন্দোলন আরো গতিময় করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ওমেন হলের ছাত্রীরা ভাষা আন্দোলনে দুঃসাহসিক অবদান রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ' ১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল।... সকাল আটটায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের উপর ভীষণ লাঠিচার্জ হলো।... কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল।.... তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল।.... আনোয়ারা খাতুন ও অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে ( অধিবেশনে) ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন।
আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ' যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০ টায় স্কুলের মেয়েরা ( মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে স্লোগান করতে শুরু করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ' রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ', ' বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই ', ' পুলিশি জুলুম চলবে না '- এমন নানা ধরনের স্লোগান।
আজকের এই লেখার সীমিত পরিসরে কয়েকজন ভাষাসৈনিক নারীর অবদানের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি,
ড. শাফিয়া খাতুন: ১৯৫১-৫২ সালে ড. শাফিয়া খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভিপি ছিলেন। ১৯৫২ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করলে ছাত্র-জনতার মধ্যে তাৎক্ষনিকআবে যে প্রতিক্রিয়া হয় শাফিয়া খাতুন তাতে আন্দোলিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হোস্টেল, চামেলি হাউজের ছাত্রীদের নিয়ে বৈঠক করেন। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রীদের নিয়ে এক দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার আহবান জানিয়ে সামনে এগিয়ে যান। ধর্মঘট চলাকালীন ছাত্রীদের একটি মিছিলে শাফিয়া খাতুন নেতৃত্ব দেন৷ তিনি ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহিলা কলেজে ও গার্লস স্কুলে ছাত্রীদের সুসংগঠিত করে করে আন্দোলনমুখী করার কাজে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার সমাবেশকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য ছাত্রীদের পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন শাফিয়া খাতুন।
লায়লা নূর: ১৯৫২ সালে কারাবাস করে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপিকা লায়লা নূরকে। তখন তিনি ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী। তিনি মাতৃভাষা আন্দোলনে যোগদানকারী এক বিপ্লবী নারী। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ এর সকল আন্দোলনেই তাঁর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ড. সুফিয়া আহম্মদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ছিলেন জাতীয় অধ্যাপিকা সুফিয়া আহম্মদ। বায়ান্ন'র ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম সারির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠির আঘাতে তিনি আহত হন। ১৯৫২ সালে তিনি তুরস্কে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।
চেমন আরা: ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠক তমদ্দুন মজলিসের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন চট্টগ্রামের মেয়ে চেমন আরা। ১৯৫২ সালে তিনি ইডেন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী চেমন আরা বিভিন্ন সভা মিছিল ও সাংগঠনিক কাজে প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ বরকতের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে বের হওয়া মিছিলে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
হামিদা রহমান: মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলাবাজার গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের আমতলায় নিয়ে আসার দায়িত্ব ছিল হালিমা খাতুনের উপর। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্য দেয়ার পর পরই স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় আমতলা। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হামিদা রহমানের নেতৃত্বে ' রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ' ধ্বনিতে মুখরিত মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরকে প্রকম্পিত করেছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪ ধারা ভেঙে প্রথম বের হয় ৪ জনের মেয়েদের দল। জুলেখা, নূরী, সেতারার সঙ্গে হালিমা খাতুনও ছিলেন। পরবর্তীতে ভাষা সৈনিক হামিদা রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়। তিনি পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে ছেলেদের পোশাক পরিধান করে যশোর কলেজের বৈঠকের সভায় যোগ দেন।
মাহবুবা খাতুন: ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন, ' বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।' আন্দোলনের শুরুর দিকে একজন ছাত্রীর মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মনে উদ্দীপনা যোগাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি ছিলেন আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক।
ড. হালিমা খাতুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী হালিমা খাতুন ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য নেয়া প্রস্তুতিমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একুশের সকালে তার দায়িত্ব ছিল পিকেটিং করা। তিনি আহত ভাষা সৈনিকদের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতেন।
শরিফা খাতুন: ফেনী মহকুমার শশ্মদি ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামে নারী ভাষা সৈনিক শরিফা খাতুনের জন্ম। ফেনীর একটি স্কুলের ছাত্রী থাকাকালীন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দু'একটি মিছিলেও তিনি অংশ নেন। তখনও ভাষা আন্দোলন শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গটি প্রকাশ্যে আসে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের শাসক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা দিলে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের ছাত্রীদের সাথে সে মিছিলে অংশ নেন শরিফা খাতুন। ভাষা সৈনিক লায়লা নূরের সঙ্গে মিছিলে-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন শরিফা খাতুন।
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: ভাষা সৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷ ১৯৪৮ সালে যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার প্রতিবাদে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তখন তিনি চট্টগ্রামের রাউজানে অবস্থিত মহমুনি এ্যালো পালি ইন্সটিটিউটের ছাত্রী ছিলেন।
মমতাজ বেগম: রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম নারী নেত্রী নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগম। সরকার ও সমাজের সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন খান এবং ডা. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শহীদদের রক্ত শপথে নারায়নগঞ্জবাসীকে ঐক্য আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন। ফলে কারাগার বরণ করেন। তাঁর গ্রেফতারে সারাদেশে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, কারাগার থেকে বন্ড সই করে মুক্তিলাভে অস্বীকৃতি জানানোয় মমতাজ বেগমের স্বামী তাকে তালাক দেন। মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধে সামিল হয়ে তিনি হারান নিজের সাজানো সংসার।
রওশন আরা বাচ্চু: ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় রওশন আরা বাচ্চু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। নারী ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনের অন্যতম সারথি ছিলেন। তিনি জনমত সমর্থনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় ইডেন মহিলা কলেজ এবং বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সংগঠিত করে আমতলার সমাবেশের স্থানে নিয়ে আসেন৷ ১৪৪ ধারা ভঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলায় পুলিশ কর্তৃক লাঠিচার্জের শিকার হন। এ ঘটনায় অনেক নিহত ও আহতদের তালিকায় তিনিও আহতদের একজন ছিলেন।
যোবেদা খাতুন চৌধুরী: সিলেটের নারীদের ভাষা আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল যোবেদা খাতুন চৌধুরীর। তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন শাহেরা বানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেসা, সৈয়দা নজিবুন্নেসা খাতুন, প্রধান শিক্ষয়িত্রী রাবেয়া খাতুন প্রমুখ নারী যোদ্ধা।
সুফিয়া কামাল ও নাদেরা বেগম: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন৷ শুধু তাই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমন-নীতির অঙ্গ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান৷ ভাষা আন্দোলনের অনেক কর্মীর সঙ্গে কবির ছিল নিবিড় যোগাযোগ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ভাষাকন্যা নাদেরা বেগম পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপন করে কবি সুফিয়া কামালের বাসায় ছিলেন। কিছুদিন সুফিয়া কামালের বাসায় থাকার পর লোকের আনাগোনায় কেউ তাঁকে চিনে ফেলে। তিনি ঠিকানা বদল করেন।পরে পুলিশ নাদিরা খাতুনকে গ্রেফতার করে এবং বন্দি করে।কারাগারে অন্যান্য রাজবন্দীদের সাথে নাদিয়া খাতুন কঠিন নির্যাতনের শিকার হন।
ময়মনসিংহে ছাত্রী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় ১৫ দিনের জন্য নজরবন্দি হন তাহমিনা সাইদা। সিলেটের ছাত্রী সালেহাকে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য স্কুল থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়৷ তার জীবনের এই কারণে আর পড়াশোনা হয়নি। বায়ান্ন'র ভাষা আন্দোলনে সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা নারীদের মধ্যে আছেন সনজীদা খাতুন, রাণী ভট্টাচার্য, নুর জাহান বেগম, রাবেয়া খাতুন, মিসেস কাজী মোতাহার হোসেন, সৈয়দা শাহরে বানু চৌধুরী, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, সুরাইয়া ডলি, সুরাইয়া হাকিম, ফরিদা বারি, জহরত আরা, কামরুন নাহার বেইলি, হোসনে আরা, ফরিদা আনোয়ার, তালেয়া রহমান সহ আরো অনেকে নাম না জানা নারী ভাষা সৈনিক।
পুরুষ -নারীর সম্মিলিত সক্রিয় আন্দোলনে মায়ের ভাষায় কথা বলার সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে। ইউনেস্কো বাংলা ভাষার আন্দোলন, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি বিশ্বব্যাপী সকল বাঙালির জন্য পরম গর্বের বিষয়। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, অন্যান্য অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানান সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার ভাষা আন্দোলনে নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় না। ভাষাকন্যারা পুরুষের পাশাপাশি গণজমায়েতে বক্তৃতা করেছেন। কারাবরণ, হুলিয়া ভোগ, পুলিশি নির্যাতন, আত্মগোপনকারীদের আশ্র্য় দিয়ে দিয়েছেন। জানা যায় প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণজনিত খরচ জোগাতে গায়ের অলংকার খুলে দিয়েছেন অনেকে। শহীদ মিনার গড়ার জন্য সারারাত ইট বহন করেছেন মেয়েরা। তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল- মাতৃভাষার সম্মান আদায় করা। তাহলে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখার জন্য অগণিত ভাষা সৈনিক একুশে পদক পেলেও, ভাষাকন্যাদের অবহেলা করার কারণ কি? তাঁদের উপেক্ষিত না রেখে স্বীকৃতি দেওয়ার জোর আবেদন জানাচ্ছি। বাঙালি নারীর অগ্রগতিতে ভাষা আন্দোলন বিরাট ভূমিকা রেখেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহসী নারীদের ভূমিকা তাদের জাতীয় বীরে পরিণত করেছে। আমাদের উচিত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা এবং দেশপ্রেমে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে সঠিক ইতিহাস জানানোর উদ্যোগ নেওয়া।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল। মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গাছ
চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল। সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।