৩০ নভেম্বর, ২০২৫
কোচবিহারের রাজ আমলের তাজিয়া এবং উত্তর প্রজন্মের শিল্পী এসরাফ হোসেন
কোচবিহারের রাজ আমলের তাজিয়া এবং উত্তর প্রজন্মের শিল্পী এসরাফ হোসেন

 

কোচবিহারে রাজ আমল থেকে হিন্দু ধর্মের রাসযাত্রা উপলক্ষে যেমন রাসচক্র ব্যবহৃত হয়ে আসছে, ঠিক তেমনি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের মহরমে তাজিয়া তৈরির রীতিও রাজ আমল থেকেই পালিত হচ্ছে। মহরমের তাজিয়ার সৃষ্টি রাসচক্রেরও পূর্বে। কোচবিহার শহরের দক্ষিণে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে কোচবিহার-দিনহাটা সড়কের পশ্চিম তোর্সার নদীর সন্নিকটে তথা হরিণচওড়া গ্রামের গুদাম মহারানিগঞ্জে এক তোর্সাপীর বসবাস করতেন। এই পীর সম্পর্কে সাল-তারিখ সহ বিষদ তথ্য সেভাবে পাওয়া যায় না। তবে তিনি খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে তোর্সা নদীর তীরে হরিণচওড়া গ্রামে সাধন-ভজন করতেন। তিনি নানারকম অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। সেই ক্ষমতা গুণে তিনি তার ভক্তদের মনোকামনা পূরণ করতেন। তাছাড়া পাগলা কুকুর কামড়ালে তিনি প্রতিশোধক হিসেবে ঔষধও দিতেন। তাই তিনি তোর্সাবাবা নামেও বিশেষ পরিচিত ছিলেন। তাকে কেন্দ্র করে গুদাম মহারানিগঞ্জে (হরিণচওড়া) একটি দরগা গড়ে ওঠে। হরিণচড়া গেলে এখনও শোনা যায়, এই পীর দীর্ঘ সময় ধরে তোর্সার জলে ডুবে থেকে একটি হাত জলের ওপরে তুলে ধরে দর্শনার্থীদের নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানাতেন। আর সেকারণেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে তার ভক্ত ছিলেন। মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণও নাকি তার বিশেষ ভক্ত ছিলেন। তিনি সেই পীরের উদ্দেশ্যে সাত বিঘা জমি পীরোত্তর বা পীলপাল করেন। সেই পীরের পরলোকগমনের পর তার আস্তানাতে ৪ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বেদীর উপর একটি মাজার নির্মাণ করা হয়। মহরম উৎসব পালন, মহরমকে কেন্দ্র তাজিয়া নির্মাণ কিংবা মেলার আয়োজনের সঙ্গে এই মাজারের সরাসরি কোনও নেই। তবে আগে প্যারেড গ্রাউন্ডে বা মেলার মাঠে এই তাজিয়া তৈরি হত। এরপর সেই পূর্ণাঙ্গ তাজিয়াটি নিয়ে শহর পরিক্রমাও করা হত। মাঠে ফিরে আসার পর সেখানেই লাঠি খেলা হত এবং সারাদিন ধরে সেখানে অনেক লোকের সমাগমন ঘটত। কিছু সমস্যার কারণে বিশালাকৃতির তাজিয়ার গঠন যেমন হ্রাস পায়, তেমনি বন্ধ হয়ে শহর পরিক্রমার রীতিও। অতঃপর গুদাম মহারানিগঞ্জেই তা তৈরি করা হয়। বর্তমানে এই মাজার দেবোত্তর ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রতি বছর এখানে মহরমকে কেন্দ্র করে এক জমজমাট মেলা বসে। এই মেলা কোচবিহারবাসীর মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছা দেয়। তাজিয়া নির্মাণ সহ অন্যান্য সমস্ত খরচা এখনও দেবোত্তর ট্রাস্টই বহন করে চলেছে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে শত শত মানুষ হরিণচওড়াতে উপস্থিত হয়ে এ দিন মাজারের উদ্দেশে কেউ বাতাসা, কেউ মোম-ধূপকাঠি, কেউ লাল নিশান, কেউবা পায়রা উৎসর্গ করে নিজের মনের বাসনার কথা জানায়। অথচ ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মহান আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কাউকে ঈশ্বর রূপে জ্ঞান করা অথবা তার কাছে দোয়া প্রার্থনা করা গর্হিত অপরাধ। দরগা বা মাজারকে ঘিরে পূজার্চনা বা আশীর্বাদ প্রার্থনাও ইসলাম স্বীকৃত নয়। এই প্রসঙ্গে সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস গ্রন্থে জানিয়েছেন, “যাঁহারা বিশুদ্ধ কোরানী বা মোহাম্মাদী ইসলামের পক্ষপাতী, তাঁহারা দরগাকে আশ্রয় করিয়া ধর্মানুষ্ঠান পছন্দ করেন না, অনেকে এ সম্বন্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং ‘পীরপরস্তী’ অর্থাৎ ‘স্থবির পূজা’ এবং ‘গোর পরস্তী’ অর্থাৎ ‘সমাধি পূজা’ বলিয়া অবজ্ঞা করেন ; কিন্তু সারা বাঙ্গালা, সারা ভারত ও পূর্ব ঈরান জুড়িয়া পীরের দরগায় এবং মাজারে মুসলমান (এবং মুসলমানদের দেখাদেখি হিন্দু) ভক্তবৃন্দ শীরনী দিয়া জোরের সঙ্গে পূজা করিতেছে।”

 

হরিণচওড়া গুদাম মহারানিগঞ্জে অবস্থিত তোর্সা পীরের মাজার

 

        তাজিয়া নির্মাণের সঠিক সময়কাল নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। তবে কোচবিহারের হরিণচওড়ার রাজ আমলের এই ঐতিহ্যবাহী তাজিয়ার নির্মাতা সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান তাজিয়া নির্মাতার পরিবারের দাবি, তাজিয়া সর্বপ্রথম বানিয়েছেন বলরামপুর নিবাসী চেঙটু নামের এক মুসলিম ব্যক্তি। তার নাম ও নিবাস ছাড়া আর কোনও তথ্য সেভাবে মেলেনি। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সাহাত মিঞা তাজিয়া তৈরি করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তিনি পরলোকগমন করলে তার পুত্র সফিউদ্দিন মিঞাও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার কোনও পুত্র সন্তান না থাকার ফলে তার কন্যা আকিয়া বিবির জামাতা আকবর আলী শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এসে এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তবে জানা যায়, রাসচক্রের নির্মাতা স্বর্গীয় আলতাপ মিঞার পূর্বপুরুষেরাও একদা এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জীবিত থাকাকালীন তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানিয়েছেন, “আগে আমার বাবাই মহরমের তাজিয়া বানাতো। তার আগে আমার দাদু এই কাজ করতো কিনা তা জানি না। বাবা যখন তাজিয়া বানাতো তখন বাবাকে কাজে সহযোগিতা করত হরিণচওড়ার আকবর আলী। পরে এক সময় বাবার কিছু ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে তাজিয়া নির্মাণ কাজটি ছেড়ে দেন এবং আকবরকে তাজিয়া বানানোর দায়িত্ব নিতে বলেন। তখন দেবোত্তর ট্রাস্ট তাজিয়া বানানোর জন্য আকবর আলীকে অনুরোধ জানায়। তখন থেকেই হরিণচওড়ার আকবর আলীই এই তাজিয়া বানাতে শুরু করে। মাঝে আমিও পরপর দু’বছর এই তাজিয়া নির্মাণ করেছি।” অর্থাৎ রাজ আমল থেকেই রাসচক্র কিংবা তাজিয়া এই দুই ঐতিহ্যের সঙ্গেই স্বর্গীয় আলতাপ মিঞা ও স্বর্গীয় আকবর আলীর পরিবার ওতপ্রোতভাবেই যুক্ত ছিলেন। এই দুই পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার দরুন তারা একে অপরের শিল্পে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। রাসচক্র ও তাজিয়া এই দুটি শিল্পের মধ্যেই শিল্পগত দিক থেকে অনেকাংশে সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় শিল্পের ক্ষেত্রেই বাঁশের ফ্রেম ও কাগজের কারুকাজ লক্ষণীয়। ঠিক সেকারণেই এই দুটি শিল্পের কাজ দুই পরিবারই জানা ছিল।

আকবর আলী তাজিয়া নির্মাণে দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকের একদম শেষে কিংবা সাতের দশকের প্রারম্ভে। এরপর তিনি দীর্ঘ আড়াই দশকেরও অধিক সময় ধরে একাজ করে গেছেন। তাজিয়া নির্মাণের দায়িত্ব লাভের পর থেকে শিল্পী আকবর আলী পরলোকগমনের (২০০০) তিন বছর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৭ খ্রি. পর্যন্ত তাজিয়া নির্মাণ করার পর তার চার পুত্রের মধ্যে তৃতীয় পুত্র একতার আলী এ কাজের দায়িত্ব তুলে নেন। তিনি তাজিয়া নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রায় এক দশক (১৯৯৮ থেকে ২০০৬) সময়কাল পর্যন্ত। ২০০৭ ও ২০০৮ পরপর দুই বছর তাজিয়া তৈরি করেছিলেন একতার আলীর ছোটো ভাই এসরাফ আলী। এরপর হঠাৎ এই পরিবারের ভ্রাতাগণের মধ্যে এই তাজিয়া তৈরি নিয়ে পারিবারিক কলহ দেখা দিলে কাজটি সম্পূর্ণ রূপে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় দেবোত্তর ট্রাস্ট। অতঃপর দু-তিন বছর এই তাজিয়া নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় শিল্পী স্বর্গীয় আলতাপ মিঞার হাতে। কেননা তিনি রাসচক্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তাজিয়াও নির্মাণ করতেন। তাই হরিণচওড়ার তাজিয়া নির্মাণের দায়িত্ব তার হাতেই তুলে দেয় দেবোত্তর ট্রাস্ট। এই প্রসঙ্গে স্বর্গীয় আলতাপ মিঞা জানিয়েছিলেন, “আমি আসাম-বক্সিতে গেছিলাম একটা মহরমের তাজিয়া বানাতে। তারপর বলরামপুরে দুইবার বানাইছিলাম মফিক মিঞার মহরমের তাজিয়া। কোচবিহারের হরিণচওড়া ধামের তাজিয়াটাও পরপর দুই বছর আমি বানাইছি।” তার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বর্তমান তাজিয়া নির্মাতা শিল্পী এসরাফ আলী জানিয়েছেন, “আমাদের ভাইদের মধ্যে তাজিয়া বানানো নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল, তাই আমরা দুই বছর কেউ তাজিয়া বানাইনি। ২০০৯ ও ২০১০ এই দুই বছর আলতাপবাবু তাজিয়া বানিয়ে ছিলেন।” এরপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাজিয়া তৈরি করে চলেছেন শিল্পী এসরাফ আলী।

তাজিয়ার বর্তমান শিল্পী এসরাফ আলী নিজ এলাকায় পেরু ডাক নামেই বিশেষ পরিচিত। তিনি তাজিয়া নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছেন ২০১১ সালে। তবে তিনি ২০০৮ থেকেই একান্ত নিষ্ঠা সহকারে এ কাজ করে চলেছেন। বলা বাহুল্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কোচবিহারের রাজ আমলের ঐতিহ্যগুলিরও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বড়োদেবীর মূর্তি, রাসচক্র কিংবা তাজিয়া সবেতেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। ভাবের পরিবর্তন না ঘটলেও গঠনগত দিকের তারতম্য অনেকাংশেই লক্ষণীয়। আজ থেকে বহু পূর্বে তাজিয়ার উচ্চতা ছিল ৬৫ হাত (প্রায় ৯৭ ফুট)। কিন্তু বর্তমানে তা ৩৩ হাত (প্রায় ৫৩ ফুট) উচ্চতায় এসে দাঁড়িয়েছে।

আলতাপ মিঞার হাতে নির্মিত ২০১০ সালের মহরমের তাজিয়া

একটি তাজিয়া তৈরি করতে উপকরণ হিসেবে মোট ২৩টি পূর্ণাঙ্গ বাঁশ, ৭০টি বাঁশের আগালি, ২ রিম সাদা আর্ট পেপার ছাড়াও রঙিন আর্ট পেপার, আঠা, পাট ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। এই সমস্ত উপকরণগুলি দিয়ে এক মাস ধরে তাজিয়া তৈরির কাজ চলে। শিল্পী এসরাফ দিনের বেলা বাঁশের স্ট্রাকচারের কাজগুলি করেন। আর রাতে কাগজের মধ্যে পেন্সিল সহযোগে বিভিন্ন নকশা এঁকে নিয়ে কেচি দ্বারা কেটে কেটে জালির কাজ করেন। ঈদ-উল-আযহা থেকে শুরু হয় এই কাজ। একমাস চলার পর ১০ আশুরার দিন এই কাজের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সময়পর্বে তিনি ৫৩ ফুট বাঁশের স্ট্রাকচারটিকে ছয় ভাগে বিভক্ত করে প্রস্তুত করতে থাকেন। স্ট্রাকচারের কাজ সমাপ্ত হলে তার ওপর নকশা করে কাটা জালির কাগজগুলি আঠা দিয়ে সেঁটে দেন। এভাবে পূর্ণাঙ্গ তাজিয়ার খণ্ডিত অংশগুলি মহরমের দিন একটির উপর আর একটি করে পরপর ছয়টি খণ্ড সজ্জিত করে গুদাম মহারানিগঞ্জের মাজারের মাঠে যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন শিল্পী এরসাফ আলী। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কাজে শিল্পীর মা আকিয়া বিবি ও স্ত্রী রমিচা বিবি সহযোগিতা করেন। আর মহরমের দিন সম্পূর্ণ তাজিয়াটি যুক্ত করার সময় সেই এলাকার বহু স্থানীয় লোক এগিয়ে এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

 

বর্তমান শিল্পী এসরাফ আলীর হাতে নির্মিত তাজিয়া

        শিল্পী এসরাফ আলী সারা বছর কাঠের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এ কাজ করেই তিনি নিজের সংসার চালান। আর বছরে একটিবার মহরমের তাজিয়া নির্মাণ করেন। রাসচক্রের কাজও তার জানা। এ বছর (২০২৫) তিনি ডাওয়াগুড়ি গ্রামের ফলিমারী এলাকাতে অনুষ্ঠিত পৌষমেলাতে শ্রী করুণা ভট্টাচার্যের (জেঙ্কিন্স স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক) উদ্যোগে কোচবিহারের রাজ আমলের রাসচক্রের আদলে রাসচক্র তৈরি করেছেন। তার হাতে তৈরি রাসচক্র পূজা করে এবং ঘুরিয়েই সেই পৌষমেলার সূচনা হয়।

শিল্পী এসরাফ আলীর হাতে নির্মিত রাসচক্র

ডাওয়াগুড়ির এই রাসচক্র তৈরি করে তিনি সাম্মানিক পেয়েছেন পঁচিশ হাজার (২৫,০০০/-) টাকা। অথচ রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া তৈরির বিনিময়ে তিনি খুবই সামান্য সাম্মানিক পান। উপরন্তু রাসের কাঠামো ও ফ্রেম যেমন তৈরি করেন পৃথক কারিগর, তেমনি তাদের সাম্মানিকও হয় পৃথক পৃথক ভাবেই। কিন্তু মহরমের তাজিয়ার কাঠামো ও ফ্রেম একই শিল্পী তৈরি করেন। রাসচক্র হয় মাত্র ৩০ ফুট, সেখানে তাজিয়া হয় ৫৩ ফুট। প্রায় দ্বিগুণ। ফলে একক শিল্পীর ক্ষেত্রে পরিশ্রমও হয় অধিক। কিন্তু পারিশ্রমিক পান নিতান্তই সামান্য। ২০১৩তে তিনি তাজিয়া তৈরি করে পেয়েছিলেন চার হাজার পাঁচশো (৪,৫০০/-) টাকা। এ বছর (২০২৫) তাজিয়া নির্মাণ করে তিনি সাম্মানিক পেয়েছেন মাত্র এগারো হাজার পাঁচশো (১১,৫০০/-) টাকা। অর্থাৎ দীর্ঘ বারো বছরে তার পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র সাত হাজার টাকা। উপরন্তু রাসের দুই কারিগর (আলতাপ মিঞা ও অরুণকান্তি রায়) দেবোত্তর ট্রাস্টের অধীনে অস্থায়ী কর্মে নিযুক্ত আছেন বা ছিলেন। কিন্তু শিল্পী এসরাফ আলীর ক্ষেত্রে এ রকম কোনও কর্মের ব্যবস্থা করেনি দেবোত্তর ট্রাস্ট। রাসের কারিগরদের মতো একটি কর্মের জন্য তারও আবেদন ছিল দীর্ঘ দিনের। কিন্তু ট্রাস্টি বোর্ড তাতে কর্ণপাত করেনি। ট্রাস্টি বোর্ডের এ হেন বিমাতৃসুলভ আচরণে শিল্পী এরসাফ কখনও ক্ষুব্ধ হন, আবার কখনও হতাশও হন। এই শিল্পকর্ম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চান, চান একটা দূরত্ব বজায় রাখতে কিন্তু পারেন না। পরের বছর তাজিয়া নির্মাণের সময় এলেই তিনি পূর্বের সমস্ত মান-অভিমান ভুলে গিয়ে পুনরায় তাজিয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কেননা এর পশ্চাতে রয়েছে এক দায়বদ্ধতা, যা তিনি কখনই এড়িয়ে যেতে পারেননি। নিজের অন্তরের সাময়িক আবেগকে দূরে সরিয়ে রেখে এক মাস ধরে তিনি তাজিয়ার সঙ্গে এক প্রকার যাপন করেন। শুধু তিনিই নন, এই কাজে সর্বদা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তার মা আকিয়া বিবি এবং স্ত্রী রমিচা বিবি। পরিবারের সদস্য ও সদস্যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, শ্রদ্ধা ও ভক্তির মিশেল রূপ ধরা পড়ে তাজিয়ার অঙ্গে।

২০১৩তে শিল্পীর সাম্মানিক ছিল মাত্র ৪,৫০০/- টাকা

২০২৫-এ শিল্পী সাম্মানিক পেয়েছে মাত্র ১১,৫০০/- টাকা

 

        শিল্পী এরসাদ আলীর শিল্পকর্মই তাকে গৌরব এনে দিয়েছে ঠিকই, তবে তার গৃহে রয়েছে অসুস্থ মা সহ স্ত্রী ও দুই কন্যা। নিজের সমস্ত অভাব অনটনকে দূরে সরিয়ে রেখে রাজ আমলের ঐতিহ্য ও পিতৃপুরুষের গৌরবকে বয়ে নিয়ে চলেছেন বছরের পর বছর। দেবোত্তর ট্রাস্টের কাছে একান্ত অনুরোধ, তারা যেন রাজ আমলের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকা শিল্পী ও কারিগরদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে এবং সেই সমস্ত শিল্পীদের আর্থিক অভাবের দিকটিও যেন সুনিশ্চিত করে। অদূর ভবিষ্যতে এই শিল্পীরাই তাদের একদিন মহারাজাদের এই দায়িত্ব তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেবে। সেই ঐতিহ্য বহন করতে গিয়ে আর্থিক অভাব যেন কোনওভাবেই তার কাছে অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়। কেননা যদি শিল্পী বাঁচে, তবেই তো শিল্প বাঁচবে।

তাজিয়ার পূর্বের শিল্পী একতার আলী

তাজিয়ার বর্তমান শিল্পী এসরাফ আলী

 

তথ্যসূত্র :

১) দাস, বিশ্বনাথ, কোচবিহারের পুরাকীর্তি, দি সী বুক এজেন্সী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, মার্চ ২০২২, পৃ. ৭৭

২) পূর্বোক্ত, পৃ. ৭৭

৩) চট্টোপাধ্যায়, সুনীতি, সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস, গ্রন্থালয় প্রকাশনী, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮, পৃ. ৭

৪) আকিয়া বিবির সাক্ষাৎকার, বয়স- ৬০ বছর, স্থান- গুদাম মহারানিগঞ্জ, হরিণচওড়া, কোচবিহার, তারিখ- ২০/০৭/২০২৫, সময়- বিকেল ৪টা

৫) আকিয়া বিবির সাক্ষাৎকার, পূর্বোক্ত            

৬) আলতাপ মিঞার সাক্ষাৎকার, ঠিকানা- ছাটগুড়িয়াহাটি, নেতাজি স্কোয়ার, কোচবিহার, তারিখ- ১৪/০৭/২০২২, সময়- বিকেল ৫.৩০ মিনিট

৭) আলম, মেহেবুব, কোচবিহারের রাসমেলা, রাসচক্র ও আলতাপ মিঞা, বিয়ন্ড হরাইজন প্রকাশনী, আলিপুরদুয়ার, প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০২৪, পৃ. ৮৬

৮) পূর্বোক্ত, পৃ. ৮৭

৯) দেবোত্তর ট্রাস্টের ২০২৫-এর তাজিয়া নির্মাণের অনুমতি পত্র

 

মেহেবুব আলম, গবেষক, বাংলা বিভাগ, কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়, কোচবিহার

Email: email2mehebub@gmail.com, Mob: 7063699798

 

 

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
ভবেশ বসু

আমার রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল।  মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

গদ্য৭ মে, ২০২৪
রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
সব্যসাচী হাজরা

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গদ্য৩০ আগস্ট, ২০২৪
 গাছ
হিমাংশু রায়

গাছ

চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল।  সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।

গদ্য৭ মে, ২০২৪