
২২ শে অক্টোবর,২০২৫ সাল,
সকাল ৬টা বেজে ৪৫ মিনিট
দাঁড়িয়ে আছি। কেউ ডাকেনি। একা একাই উঠে রেডি হয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছি। সকাল হচ্ছে চারিদিকে। আলো তার রঙ পাল্টাচ্ছে । নীলচে থেকে হলুদ হয়ে এরপর সে আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে যাবে। হাওয়া দিচ্ছে শিরশির। আর তাতে মাথা দোলাচ্ছে রাস্তার দুধারে অযত্নে ফুটে থাকা অজস্র ফুল। যদিও ঠান্ডা হাওয়ায় কেঁপে উঠছি মাঝেমাঝেই কিন্তু ভালোও লাগছে বেশ। জ্যাকেট টুপি টেনে নিচ্ছি। আসলে দাঁড়িয়ে আছি একটা গাড়ির জন্য। যদিও আমাদেরকে বলা হয়েছে যে গাড়ি আসবে সাতটায়। কিন্তু একটু ইমপার্শিয়ালি বললে এসব পাহাড়ি জায়গায় গাড়ি তার ড্রাইভার বা মালিকের নিজস্ব সময়ে চলে। এখানে তাদের রাজত্বে তারাই রাজা। তাই সকাল সাতটা মানে সেটা আটটাও হতে পারে আবার সাড়ে ছটাও হতে পারে। এবারে সে গাড়ি যদি একবার বেড়িয়ে যায় তাহলে আপনাকে গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে আর রেস্তও খসবে বেশ ভালোই।
তাই দাঁড়িয়ে আছি একাই। যদিও আমাদের দলে ছোটবড় মিলিয়ে আরো জনাপাঁচেক আছে। চেঁচিয়ে তাদের তাড়া দিচ্ছি মাঝেমধ্যেই, আর দাঁড়িয়ে আছি একদম রাস্তার ওপরে। একদমই “গানের ওপারে” নয়, রাস্তার ওপরে, গাড়ির জন্য।
ওহ…এই যে আপনাদেরকে বলে ফেললাম পাহাড়ি কথাটা, তাতে হয়তো আপনাদের জানতে ইচ্ছে করছে পাহাড়ে কোথায়? আসলে আমরা তো সবাই ঘুরতে ভালোবাসি, সে ভার্চুয়ালি হোক আর একচুয়ালি, আর আমিও তো “হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল”। তাই বলেই ফেলা যাক। আসলে হঠাৎ করেই একরকম আমরা গত পরশু চলে এসেছিলাম পশ্চিম সিকিমের ওখরেতে। তারপর সেখান থেকে গতকাল হিলে হয়ে ট্রেক করে এসেছি বার্সে রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারী। যদিও রডোডেনড্রন একদমই ফোটেনি এখনও, আরো দুতিন মাস পর সে দেখাতে শুরু করবে তার জলওয়া, লাল করে ফেলবে চারিদিক, কিন্তু আমরা সেখানে ঘুরে এসেছি আর বেশ ভালোই লেগেছে।

আর আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি ওখরেতে, যাবো রিনচেনপঙ। এতক্ষণ আসলে যা বলেছি পুরোটাই ভাট যাকে একটু ভালো ভাষায় বললে ভূমিকা বলা যেতে পারে। আসল প্রশ্ন হচ্ছে কেন যাব আমরা রিনচেনপঙ? এত জায়গা থাকতে পশ্চিম সিকিমের এই অখ্যাত গ্রামটিতে যাবার কি দরকার পড়ে গেল আমাদের? শুধুই ঘোরা। না, একদমই না।
সেখানে যাবার আসল কারণ হচ্ছে এই তথ্যটি যে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে গিয়েছিলেন। এই ভদ্রলোক যাকে বেশ খানিক বড় হয়ে আমি জেনেছি যে তিনি আসলে যেমন ঠাকুর হয়, যাদের আমরা প্রণাম করি কিন্তু কখনো দেখিনি, তেমন কিছু নন বরং একজন রক্ত মাংসের মানুষ। ভাবুন বন্ধুরা, ১৯১৩ সাল, আজ থেকে মোটামুটি ১১৫ বছর আগে। সেই জায়গায় আজ আমরা যাচ্ছি। বেশ একটা থ্রিলই হচ্ছে বলতে পারেন।
যাই হোক আপনারা হয়তো ইতিমধ্যে ভেবে ফেলেছেন যে গাড়ির কথা খানিক আগে আপনাদের বলেছি সে গাড়িতেই আমরা চলে যাব রিনচেনপঙে। না, একদমই না। সে শেয়ার গাড়ি আমাদের নিয়ে যাবে এই নির্জন ওখরে গ্রাম থেকে তার নিকটবর্তী সামান্য বড় জনপদ সোমবারে পর্যন্ত। সোমবারে থেকে আমাদের যেতে হবে সোরেং আর সেখান থেকে আবার গাড়ি ধরে যেতে হবে কালুক। কালুক থেকে সামান্য পথ যেতে হবে রিনচেনপঙে পৌঁছতে।
যাইহোক, আসল কথা হচ্ছে দীপাবলীর দিন যখন দুম করে বাড়ি থেকে বেরুলাম আর ঠিক হল যে আমাদের গন্তব্য হবে পশ্চিম সিকিম, সেদিনই ঠিক করে ফেলেছিলাম যেভাবেই হোক রিনচেনপঙে যাবোই। আসলে যেদিনই জানতে পেরেছি লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা কালো জোব্বা পরা লোকটা কোন ঠাকুর নন বরং মানুষ, আর কোথায়ই না তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সেদিন থেকেই আমি লোকটার ফ্যান হয়ে গিয়েছি। প্রথমে জেনেছিলাম শুধু দার্জিলিঙ, মংপু, কালিম্পঙ বা কার্শিয়াঙ ই তিনি এসেছেন বা থেকেছেন। আর যেদিন জেনেছি যে আজ থেকে ১১৫ বছর আগে তিনি রিনচেনপঙে এসেছিলেন তাতে যে কি হয়েছি তা ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না। শুধু ভাবি আজ থেকে...১১৫ বছর আগে...মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগে...এত দূরে... রিনচেনপঙে...তিনি এলেন কিভাবে? অজানাকে জানার কতটা বাসনা তার ভেতরে থাকলে কত কষ্ট স্বীকার করে তিনি এখানে এসেছিলেন।

আর যখন রিনচেনপঙে পৌঁছলাম তখন যা দেখলাম তা ভাষায় বর্ণণাতীত। কোনো পাঠক এই লেখা পড়ে এত অব্দি এসে থাকেন তাহলে দয়া করে রিনচেনপঙের ছবিগুলো একবার দেখবেন। বর্তমানে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংস্কার হচ্ছে। তাই আরো একবার সেখানে যাবার ইচ্ছে রইলো। (সঙ্গের ছবিগুলোর মনেস্ট্রির পাশ দিয়ে এগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই সেই সংস্কারস্থান।)
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল। মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গাছ
চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল। সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।