
এই প্রসঙ্গে আলোচনা সূত্রে বলা প্রয়োজন যে লোকসাহিত্য কাকে বলে। ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দে অ্যাথেনিয়াম পত্রিকায় এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন জন থমস। জার্মান শব্দ 'VOLKSKUNDE' থেকে 'FOLKLORE' শব্দটি এসেছে। যার মানে হল লোকজ্ঞান। সভ্যতার ধারাবাহিকতা হল folklore। বন্য → বর্বর → মানুষ। Folklore বলতে নিরক্ষর, কৃষিজীবী, সংস্কৃতির স্রষ্টা, ঐতিহ্যবাহী, একই ভৌগোলিক পরিবেশে অবস্থানকারী গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বোঝায়।
প্রাচীন লোকায়ত সমাজ যখন টোলকেন্দ্রিক সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার অধিকারী হয়নি কিংবা আধুনিককালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অচ্যুত থেকে গেছে, সেইসব অনগ্রসরহীন সমাজের লোকশিক্ষার বাহন হয়ে ওঠে লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক তথাকথিত বিষয়গুলি।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা দেখি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ের অধীনে সুশিক্ষিত বিদ্যা অর্জনের সুযোগ ভারতবর্ষের বহু মানুষেরই নেই। তাই সেইসব মানুষ যারা নিরক্ষর কিন্তু তাদের বিদ্যান্বেষণে সক্ষম তাঁদের শিক্ষাদানের জন্য লোকসাহিত্যের বিভিন্ন বিভিন্ন শাখা খুবই কার্যকর।
যেমন, আজ ভারতবর্ষ যে প্রায় পোলিও মুক্ত তার একটা বড় কারণ বা অবদান রয়েছে লোকগানের। লোকসাহিত্যের প্রধান শাখাগুলো - ছড়া, গান, প্রবাদ, ধাঁধা, কথা প্রভৃতিই সমাজে শিক্ষার বাহন হয়ে উঠেছে। গ্রামের নিরক্ষর মায়েরা তাদের সন্তানদের ‘টিকাকরণ’ বা ‘পালস পোলিও’ খাওয়ানোর কথা জনস্বার্থে প্রচারিত গানকে লোকগান বা ছড়ার মাধ্যমে জানতে পারে।
যেমন -
"পালস পোলিও টিকা - লিয়েছে
আমার ব্যাটা লো।"
— কোন পোস্টার পড়তে না পারলেও - নিরক্ষর মায়েরা সচেতন হতে পারে এই ছড়ার মাধ্যমে।
আবার, দেখা যায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করে খোলা মাঠে বা স্থানে। কিন্তু হাত মুখ পরিষ্কার করে না। যার ফলে নানা রোগের সৃষ্টি হয়। তবে লোক গান প্রচারের ফলে নিরক্ষর মানুষ সচেতন হচ্ছেন; অনেকে নিরামর করা গেছে নানা মারাত্মক ব্যাধি।
বর্তমানে সারা ভারতবর্ষে মাদক দ্রব্য সেবন ও মারণ ব্যাধির রূপ নিয়েছে। আর লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নিরক্ষর গ্রামের মানুষ যারা এইসব রোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। লোকসাহিত্য সেইসব মানুষদের সচেতন করার জন্য নানা ছড়া ও গান রচনা করে সুস্থ সমাজ গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। যেমন—
"মাদক দ্রব্য সেবন করলে,
প্রাণ যাবে অকালে।"
গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষদের পরোক্ষভাবে মুখে মুখে (oral) সমাজ সচেতন করে তোলার জন্য লোকসাহিত্য বিষয়ের গুরুত্ব অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা দেয়, সচেতন করে ইতিহাস সম্পর্কেও —
"ভাত মারল নীল বাঁদরে
জাত মারল পাদরী ধরে।"
এছাড়া—
"বাকি, বাক্যে বাটপারি
এই তিনে দোকানদারি।"
নিরক্ষর মানুষ পুরাণ সম্পর্কেও জানতে পারে লোকসাহিত্যের অন্যতম ধারা প্রবাদের মাধ্যমে। যেমন—
"একে রামে রক্ষা নেই
সুগ্রীব দোসর।"
এছাড়া — "All that glitters is not gold."
কিংবা, "অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী," ইত্যাদি প্রবাদের মাধ্যমে নিরক্ষর মানুষ সচেতন হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
(১) সৌগত চট্টোপাধ্যায়, 'লোকসংস্কৃতির বারমহল অন্দরমহল', পুস্তক বিপণী, প্রথম সংস্করণ, ২০১৪।
(২) হরিদাস পালিত, 'আদ্যের গম্ভীরা', দে'জ পাবলিশিং, তৃতীয় সংস্করণ, বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৭।
(৩) বরুণ চক্রবর্তী, 'লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি', দে'জ পাবলিশিং।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল। মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গাছ
চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল। সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।