২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
মানুষের বন্ধন
মানুষের বন্ধন

 

আজ পূর্ণিমাI আকাশের বুক থেকে নেমে আসছে রূপোলি জ্যোৎস্নার স্রোতI সমগ্র প্রকৃতি যেন সেই উজাড় করা জ্যোৎস্না মেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কলঙ্কহীন নিঝুম রাতের আকাশে কোথাও এতটুকু মেঘের চিহ্ন নেইI শুধু দু-একটা নিশাচর পাখি মধ্যরাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে। ঠিক এই সময়ে, নিঃসঙ্গ রাত্রির নির্জন মেঠোপথ ধরে এক ব্যক্তি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে আসছেন। হাতে ব্যাগ, বগলে লাঠি। বোঝা যায়, এই পথটুকু পার হতে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। অবসন্ন দেহটা টানতে টানতে একটা সময় সেই ব্যক্তি পথের পাশে এক জীর্ন স্মৃতিসৌধের কাছে এসে দাঁড়ালেন। স্মৃতিসৌধটি দিবাকরেরI দিবাকর মন্ডল, জমি আন্দোলনের প্রথম শহীদI আর ওই ব্যক্তি? তাঁরই এক সময়ের ছায়াসঙ্গী মোল্লাপাড়ার - রফিকI পথের পাশে বট গাছের নিচে দিবাকরের সেই স্মৃতিসৌধটি যেন এখনো অপেক্ষা করে আছে কোনো এক স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রতীক্ষায়I প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল, সে নেইI ভাবতে গিয়ে রফিকের গলার কাছে কান্না যেন দলা পাকিয়ে উঠল। সেদিনের ভয়ংকর স্মৃতি রফিক নিজেও বহন করে চলেছেI এখনো বাঁ পায়ের উরুর মধ্যে জমে থাকা স্প্রিন্টারের টুকরো তাকে ভোগায়। কিন্তু তার থেকে বেশি যন্ত্রণা দেয়; যখন দেখে, সেদিন যাদের বোমা বন্দুকের গুলিতে দিবাকর মরে ছিল, তার মতো অনেকে আহত হয়েছিল। আজ তারাই ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দল পরিবর্তন করে চলে এসেছে ক্ষমতাসীন দলেI আর কি আশ্চর্য! কোনো কৈফিয়ৎ ছাড়াই তারা দলের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত! এসব দৃশ্য দেখে রফিকের কাছে সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগেI সে মনে মনে আওড়ায়, ‘তাহলে এত লড়াই, এত ত্যাগের মূল্য কী রইল! শুধু কি তাদের মতো গরিবদের মূল্যবোধ নামক সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা তুলতে ব্যস্ত?’ রফিক ভাবতে পারে না। সেদিনের লড়াইয়ে হিন্দু- মুসলমান সবাই সমবেত হয়ে প্রতিরোধ গড়েছিলI ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একে অপরের সাহায্যে। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে সে দেখতে পাচ্ছে, সেই চেনা মানুষ, চেনা চরিত্রগুলো কেমন যেন ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছেI বদলে যাচ্ছে তাদের মধ্যে সম্পর্কের চিরকালীন বন্ধনI এমন অবিশ্বাস, এমন সন্দেহ তো কই আগে তো কখনো ছিল না? তারা একে অপরের সঙ্গে ধুলোবালি মেখে শৈশব, কৈশোর, যৌবন পার করে আজ প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে একি দেখছে! এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন, এই বিশ্বাসহীনতা দেখার জন্য কি তারা গুলি খেয়েছিল? প্রাণ দিয়েছিল দিবাকরের মত সোনার ছেলেরা! রফিক ভালো করেই জানে, রাজনীতির কারবারিরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সাম্প্রদায়িক বিভাজন’ নামক এই নতুন ফন্দি এঁটেছে। ধর্মীয়-বড়ি গিলিয়ে মানুষের প্রাথমিক চাহিদা, খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের অভাবকে ভুলিয়ে দিয়েছে। মানুষও বিচার বিবেচনা না করে সেই বিষ বুকে ঢেলে অন্ধ উন্মত্ততায় মেতে উঠেছেI যা আগে কখনো ছিল বলে তার মনে হয়নি। কিংবা থাকলেও তার এতটাই প্রচ্ছন্ন ছিল যে কোনোদিন প্রকট হয়নি। রফিক দেখেছে, হিন্দু মুসলমানের যে অটুট বন্ধন সেটা এই কয়েক বছরের মধ্যে যেন কোথাও একটু আলগা হয়ে গেছেI পরস্পর বিশ্বাসহীনতা ক্রমশ একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও সে আর আগের মতো রাতবিরেতে হিন্দু পাড়ায় আসতে পারেনা, পুরনো মানুষদের সঙ্গে গল্প করতেও পারেনা । প্রত্যেকে তাকে যেন কেমন সন্দেহের চোখে দেখে, আড়ালে আবডালে ফিস ফিস করে কথা বলে! অথচ দিবাকর মারা যাবার পর তারই উদ্যোগে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছিল। প্রত্যেক বছর দিবাকরের মৃত্যুদিনকে শহীদ দিবস হিসাবে পালন করার জন্য সকলের সঙ্গে সেও হাজির হত I কিন্তু গত চার-পাঁচ বছরে সবকিছুর মতো মানুষের সম্পর্কও যেন কেমন পাল্টে গেল! রামচন্দ্রপুর গ্রামটাও যেন ভুলে গেল তার সন্তান দিবাকরের কথা। অথচ প্রথম কয়েক বছর দিবাকরকে নিয়ে কী উন্মাদনা! কী আবেগ! তাহলে কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সবকিছু ভুলে যায়? মুছে ফেলে তার সকল অতীত স্মৃতি! হয়তো তাই। কিন্তু রফিক ভুলতে পারেনা কেন? কেন, তাকে বার বার টেনে নিয়ে আসে এই বীর যোদ্ধার স্মৃতি সৌধের পাশে! এসব দৃশ্য দেখে বয়সের ভারে ক্লান্ত, ধ্বস্ত রফিকের দীর্ঘশ্বাস শুধু লম্বা হয়I মধ্যরাতে এই স্মৃতিসৌধের পাশে দাঁড়িয়ে তার এখন খুব মনে পড়ছে বন্ধু, নেতা, তার অতি আপনজন শহীদ দিবাকরের কথাI অকুতোভয় এক অসম সাহসী বলিষ্ঠ যুবক। বিয়ে করেনি। বৃদ্ধ বাবা মাকে রেখে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভূমিরক্ষা আন্দোলনেI পরোয়া করেনি কোন নিষেধI সে শুধু বলেছিল; রফিক ভাই, তোমরা সঙ্গে থেকো বাকিটা আমি দেখে নেব। এমন এক প্রাণচঞ্চল যুবককে সেদিন চোখের সামনে ছটফট করে মরতে দেখে রফিকের বুকটা এখনো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে। সেই শোকে বছর ঘুরতে না ঘুরতে তার অভাগিনী মা’টা মারা গেল। বুড়ো বাপটা বহুদিন বেঁচে ছিল বটে! কিন্তু সন্তান হারানোর যন্ত্রণা আর স্ত্রী বিয়োগের শোক তিনি সামলাতে পারেননি। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়লেন। প্রথম প্রথম সবাই তাকে সাহায্য করলেও, ধীরে ধীরে সেই সাহায্যটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। রফিক অনেকদিন তাকে নিজের হাতে খাইয়েছে। কিন্তু সেও তো দরিদ্রI শরীরে স্প্রিন্টারের ক্ষত নিয়ে নিত্য অভাব অভিযোগ সঙ্গী করে তাকেও বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হচ্ছেI তবুও তার মধ্যে সে যতটুকু রোজগার করতো তার একটা অংশ দিবাকরের বাপের জন্য বরাদ্দ রাখতো। বুড়োটা তাকে বড় ভালবাসত কিনা! হয়তো রফিকের মধ্যে তিনি খুঁজে পেতেন তাঁর দিবাকরকেI তাই অপ্রকৃতস্থ হলেও রফিককে তিনি ঠিক চিনতে পারতেন। কাছে এলে শান্ত হয়ে যেতেন। বছর আষ্টেক আগে মানুষটা মারা যাওয়ার পর, রফিক নিজের কাঁধে সব দায়িত্ব তুলে নিয়ে তাঁর পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করেছিল। সেই সময়গুলো এখন সে পার হয়ে এসেছে। প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও তাকে এই স্মৃতিসৌধ টেনে এনেছে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। সে জানে না, আর কত দিন এখানে সে আসতে পারবে! দেখে যেতে পারবে কিনা তার হারিয়ে যাওয়া সময়কেI দীর্ঘশ্বাস গোপন করে রফিক উঠে দাঁড়ায় I

আজ ২৩শে এপ্রিলI এই দিন দিবাকর শহীদ হয়েছিলI দিবাকরের নিজের গ্রাম রামচন্দ্রপুর তাকে ভুলে গেলেও রফিক ভুলতে পারেনা! তাই দিনের আলোতে সে আসতে না পারলেও, তার ভাই, তার নেতা, তার প্রিয় বন্ধু দিবাকরকে শ্রদ্ধা জানাতে সে এই মধ্য রাতকে বেছে নিয়েছে। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে রফিক অনাদরে পড়ে থাকা স্মৃতি সৌধের উপরে জমে ওঠা ধুলো, গাছের পাতা ধীরে ধীরে পরিষ্কার করেI তারপর সঙ্গে আনা ধূপ পরম যত্নে সৌধের সামনে জ্বালিয়ে দেয়। চারিদিকে ছড়িয়ে দেয় শুকিয়ে যাওয়া কিছু নামহারা বুনো ফুল। ব্যাগ থেকে বার করে আনে একটা শুকনো রজনীগন্ধার মালাI সেটি পরম মমতায় রফিক স্মৃতিসৌধের উপরে রেখে মুষ্ঠিবদ্ধ ডান হাত কপালে ঠেকায়। তারপর সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে বলে ওঠে, প্রিয় সাথী দিবাকর মন্ডল অমর রহেI তোমাকে আমি ভুলছি না ভুলবো নাI তার এই গগনবিদারী চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র চরাচর জুড়ে। বাতাসে বাতাসে পৌঁছে যায় পাড়ার প্রতিটি ঘুমন্ত বাড়ির দরজায়। ঘুম ভেঙে যায় গোটা পাড়ারI ছুটে আসে তারাI হাতে তাদের আগ্নেয়াস্ত্রI জ্যোৎস্না রাতের উজ্জ্বল আলোয় চকচক করে ওঠে তাদের হাতের ধারালো সেই অস্ত্রগুলোI শান্ত রফিক নির্বিকারI সবাই দেখে ধুলো জমা স্মৃতিসৌধটা আজ যেন নতুন করে সেজে উঠেছে। ধূপের গন্ধে স্থানটা বড়ো পবিত্র, বড়ো মোহময় বলে মনে হল। চারদিকে ছড়ানো বুনোফুলের পাপড়ি ফিরিয়ে এনেছে শহীদের স্মৃতিকেI আর স্মৃতিসৌধের উপরে চড়ানো শুকনো রজনীগন্ধার মালাটি যেন অমরত্বের গান গেয়ে চলেছেI গ্রামের মোড়ল বারীন হালদার এগিয়ে আসে। সে চিনতে পারে রফিককেI কিছুক্ষণ স্তব্ধ বিস্ময়ে রফিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর দু’হাত ধরে বারীন উচ্ছ্বসিত আবেগে কেঁদে ফেলে। আমাদের ক্ষমা করে দাও ভাই। আমরা রাজনৈতিক নেতাদের প্ররোচনায় পড়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তোমাদের শত্রু ভেবে বসে ছিলামI তাই ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের সন্তান দিবাকরের কথা। ভুলে গিয়েছিলাম তার আত্মত্যাগের কাহিনী l ভুলে গিয়েছিলাম নিজেদের অস্তিত্ব আর হৃদয়ের সম্পর্ক। তুমি আমাদের মনে করিয়ে দিলে ভাই, আমরা সবাই মানুষ। মানুষের এই বন্ধন কখনো ছিন্ন হওয়ার নয়। বারীন হালদার সকলকে ডেকে নেয়I তারপর খোঁড়া রফিককে কাঁধে তুলে ওরা এগিয়ে চলে তার গ্রাম কল্যাণপুরের দিকেI রফিক স্পষ্ট অনুভব করে, শহিদ দিবাকরের স্মৃতিসৌধ আর তারই ভাঙ্গা ক্রাচ যেন পাশাপাশি বসে দিন বদলের গল্প বলে চলেছে।   

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

সোয়েটার
অবিন সেন

সোয়েটার

গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।

গল্প৭ মে, ২০২৪
এখানে আসবে না কেউ
রঙ্গন রায়

এখানে আসবে না কেউ

চেক - হ্যালো টেস্টিং - শুনতে পাচ্ছেন? শুনুন – জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে গেল। ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। দেওয়ালে ঘষটানির একটা শব্দ। পুরোনো বছর উড়ছে। আমি ৩১শে ডিসেম্বরে এসেই থমকে গেছি। বাইরে নতুন বছর চলছে, আমি পুরোনো বছরে। কীরকম অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয় ভাবে দেওয়াল ঘড়িটাও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।

গল্প৭ মে, ২০২৪
অবনী বাড়ি আছো
পার্থসারথী লাহিড়ী

অবনী বাড়ি আছো

“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?”

গল্প৭ মে, ২০২৪