একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই উঠোনে জ্বলে উঠত আলো-প্রদীপ, আর মানুষের ভেতরে জ্বলে উঠত গল্পের আলো। নানি-দিদা-ঠাকুমার কণ্ঠে শোনা নীতিকথা, বাবার শাসনে লুকোনো মমতা, মায়ের চোখে নিঃশব্দ শিক্ষা- এসবই গড়ে তুলত মানুষের ভিত। আজও আলো জ্বলে, কিন্তু তা প্রদীপের নয়- মোবাইলের স্ক্রিনে; আজও শব্দ আছে, কিন্তু তা কথোপকথনের নয়- নোটিফিকেশনের। আলো বেড়েছে, অথচ অন্ধকারও গভীর হয়েছে- এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে সমগ্র ভারতবর্ষ- শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে, প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে প্রায় প্রতিটি ঘরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষার সঙ্গে কি মূল্যবোধও বেড়েছে? বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, এখন প্রায় ৬৫% সময় কেটে যায় মোবাইলের ভার্চুয়াল জগতে। বাস্তবের সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে “অপশনাল”, আর ভার্চুয়াল পরিচয় হয়ে উঠছে “প্রাধান্যপ্রাপ্ত”। এক ছাত্র পরীক্ষায় প্রথম হলেও, যদি সে সহানুভূতি হারায়- তবে সে কি সত্যিই শিক্ষিত?
এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতেও এই সংকট স্পষ্ট। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে একাকীত্ব ও মানসিক চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে ব্যক্তিস্বাধীনতার বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করেছে; রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৪০% নিজেদের একাকী মনে করে। অর্থাৎ সভ্যতা যত এগোচ্ছে, মানুষ তত একা হয়ে পড়ছে- এ এক নিঃশব্দ বিপর্যয়।
এই প্রেক্ষাপটে Mahatma Gandhi-এর সতর্কবাণী যেন আজ আরও প্রাসঙ্গিক- “Education without values..... makes a man a clever devil.” সত্যিই, মূল্যবোধহীন শিক্ষা কেবল দক্ষতা তৈরি করে, মানুষ তৈরি করে না। তাই বর্তমান প্রজন্মকে এককভাবে দায়ী করা অন্যায়; কারণ তারা সেই সমাজেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে কেবল নম্বর, পদমর্যাদা ও সম্পদ।
তবু অন্ধকারের মধ্যেও আলো খোঁজার দায়িত্ব আমাদেরই। পরিবার যদি আবার সময় দেয়, বিদ্যালয় যদি পাঠ্যবইয়ের বাইরে জীবনের পাঠ শেখায়, এবং সমাজ যদি সৎ ও মানবিক উদাহরণ তুলে ধরে-তবে পরিবর্তন অসম্ভব নয়। মূল্যবোধ কোনো আলাদা বিষয় নয়; এটি জীবনের প্রতিটি ছোট আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে- একটি “ধন্যবাদ”, একটি “ক্ষমা”, কিংবা একটি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটা খুব সহজ- আমরা কি কেবল সফল মানুষ তৈরি করতে চাই, নাকি সত্যিকারের মানুষ? প্রযুক্তি আমাদের আকাশ ছুঁতে শিখিয়েছে, কিন্তু যদি মাটির টান ভুলে যাই, তবে সেই উড়ান অর্থহীন। কারণ ইতিহাস মনে রাখে না কেবল কতদূর এগিয়েছিলাম, বরং মনে রাখে- কতটা মানুষ হয়ে উঠেছিলাম।