
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালির মন ও মননে যে অভূতপূর্ব নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার তর্কাতীত কেন্দ্রবিন্দু। কবি, ঔপন্যাসিক, সুরকার ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় বিশ্বজোড়া হলেও, একজন নিভৃতচারী আধ্যাত্মিক সাধক এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক হিসেবে তাঁর যে অবিসংবাদিত রূপ রয়েছে, তার শ্রেষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ দলিল হলো 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালা। এটি নিছক কোনো প্রথাগত সাহিত্যিক রচনা নয়; বরং এটি হলো কবির অন্তর্জীবনের এক ধারাবাহিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আধ্যাত্মিক দিনলিপি, যা উপনিষদের শাশ্বত প্রজ্ঞাকে আধুনিক মানবজীবনের সংকট ও সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে স্থাপন করেছে। দীর্ঘ সাধনায় রবীন্দ্রনাথের দর্শন, জীবনদৃষ্টি এবং সাহিত্যকর্মের গভীরে প্রবেশ করলে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর সমগ্র সৃষ্টির যে বিশাল মহীরুহ, তার শেকড় প্রোথিত রয়েছে এই শান্তিনিকেতনের আধ্যাত্মিক মৃত্তিকায়।
এই মহামূল্যবান গ্রন্থটির ঐতিহাসিক পটভূমি ও রচনাকাল বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে শান্তিনিকেতনের আদি ইতিহাসে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের পিতা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীরভূমের ভুবনডাঙ্গা নামক এক নির্জন প্রান্তরে ঈশ্বরচিন্তা ও ধর্মালোচনার উদ্দেশ্যে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেওয়া হয় 'শান্তিনিকেতন' । সেই ছাতিমতলার নিভৃত প্রান্তর কালক্রমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পিতার এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে হৃদয়ে ধারণ করে রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে সেখানে মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' বা ব্রহ্মবিদ্যালয়, যা পরবর্তীতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ পরিগ্রহ করে । এই আশ্রমিক পরিবেশই ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের এবং শিক্ষাচিন্তার প্রধান পরীক্ষাগার। শান্তিনিকেতন আশ্রমে প্রতি বুধবার উপাসনা গৃহে প্রার্থনা ও ধর্মালাপের আয়োজন করা হতো। সেই উপাসনা সভায় রবীন্দ্রনাথ ছাত্র, শিক্ষক ও আশ্রমবাসীদের উদ্দেশ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ত, অন্তরঙ্গ ও গভীর আধ্যাত্মিক ভাষণ প্রদান করতেন, তারই সংকলিত রূপ হলো 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালা । এই ভাষণগুলি কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি বা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল উপনিষদের আলোকে অখণ্ড মানবধর্মের এক সার্বজনীন ব্যাখ্যা ।
রবীন্দ্রনাথের এই ভাষণগুলি প্রথমে তাঁর এক অনুরাগী কর্তৃক হুবহু অনুলিখিত হতো এবং পরে কবি নিজে সেগুলির সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করতেন । গ্রন্থটির প্রকাশনার ইতিহাস বেশ সুদীর্ঘ। ১৯০৯ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে এই প্রবন্ধগুলি মোট সতেরোটি ছোট খণ্ডে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৩৪-১৯৩৫ সালের দিকে কবি নিজেই এগুলিকে সংকলিত করে দুটি বৃহৎ খণ্ডে প্রকাশ করেন । 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালার প্রথম দিকের খণ্ডগুলির সূচিপত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, এটি কেবল খাপছাড়া উপদেশের সমাহার নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল দার্শনিক বিবর্তনের পথচিত্র । প্রথম খণ্ডে রয়েছে 'উত্তিষ্ঠত জাগ্রত', 'সংশয়', 'অভাব', 'আত্মার দৃষ্টি', 'পাপ', 'দুঃখ', 'ত্যাগ', 'প্রেম' ও 'প্রার্থনা'-এর মতো প্রবন্ধ, যা মূলত মানুষের আত্মিক জাগরণ এবং জীবনের মৌলিক সংকটগুলি নিয়ে আলোচনা করে । পরবর্তী খণ্ডগুলোতে 'দিন', 'রাত্রি', 'জগতে মুক্তি', 'সমাজে মুক্তি', 'ব্রহ্মবিহার', 'ওঁ', 'তপোবন', 'বিশ্ববোধ' প্রভৃতি প্রবন্ধের মাধ্যমে কবি মানুষের সাধারণ জীবনবোধ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববোধ ও ব্রহ্মানুভূতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছেন ।
এই প্রবন্ধমালার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়েছে উপনিষদের শাশ্বত বাণী। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদীক্ষা ও পারিবারিক পরিমণ্ডল আবর্তিত হয়েছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্ম ও উপনিষদীয় চিন্তার ওপর ভিত্তি করে । তবে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন সন্ন্যাসীদের মতো জগৎকে 'মায়া' বা সম্পূর্ণ অলীক বলে প্রত্যাখ্যান করেননি; তিনি উপনিষদের সেই জীবনমুখী ধারাটিকে গ্রহণ করেছিলেন যা এই বিশ্বসংসারকে পরমাত্মার এক আনন্দময় প্রকাশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । তৈত্তিরীয় উপনিষদের "সত্যং জ্ঞানম্ অনন্তং ব্রহ্ম" শ্লোকটি কবির আধ্যাত্মিক দর্শনের এক বড় ভিত্তি ছিল । তিনি ব্রহ্মকে কোনো দূরবর্তী নিরাকার শূন্যতা হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁকে সত্য, জ্ঞান এবং অনন্ত প্রেমের আধার হিসেবে অনুভব করেছেন।
প্রথম খণ্ডের প্রথম প্রবন্ধ 'উত্তিষ্ঠত জাগ্রত'-তে কবি কঠোপনিষদের সেই অমর মন্ত্রের প্রতিধ্বনি করেছেন, যা মানুষকে সমস্ত মোহ ও জড়তা থেকে জেগে ওঠার আহ্বান জানায় । রবীন্দ্রনাথ এখানে জাগরণ বলতে কেবল বাহ্যিক ঘুম ভাঙাকে বোঝাননি। তাঁর ভাষায়, সকাল বেলায় ঈশ্বরের আলো আপনি এসে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, কিন্তু সারাদিনের চিন্তা ও কর্ম হতে উৎক্ষিপ্ত যে কুহকের আবেষ্টন, যে মোহ আমাদের চেতনাকে আচ্ছাদিত করে রাখে, তা থেকে চিত্তকে নির্মল উদার শান্তির মধ্যে বাহির করে আনবে কে? দিন যখন নানা কর্ম, নানা চিন্তা এবং প্রবৃত্তির ভিতর দিয়ে আমাদের চারদিকে মাকড়সার জালের মতো একটি আবরণ গড়ে তোলে, তখন আমাদের অন্তরাত্মা থেকে ক্ষণে ক্ষণে ধ্বনিত হওয়া প্রয়োজন— 'উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত' । এই জাগরণই হলো আধ্যাত্মিক সচেতনার প্রথম সোপান।
জাগরণের পরেই আসে 'সংশয়'। রবীন্দ্রনাথের মতে, ঈশ্বরকে যে জানি না বা তাঁকে যে পাইনি—এই অনুভবমাত্র না করার যে আত্মবিস্মৃত নিশ্চিন্ততা, সেটিই সবচেয়ে বড় অন্ধকার। আমরা মুখে ঈশ্বরকে স্বীকার করে সমাজ ও সংসারে এমনভাবে বাস করি যেন ঈশ্বর নেই । আমরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জগতের ভিতর দিয়ে চলে যাই, কিন্তু বিশ্বভুবনেশ্বরের স্থানটি আমাদের গৃহে বা মনে রাখি না। ঈশ্বরের অধিকারকে কেবল মুখের কথায় স্বীকার করে, বাকি সমস্ত জায়গায় 'আমি' বা অহংকে বসিয়ে রাখার যে স্পর্ধা, তা সংশয়ের সমস্ত বেদনাকে নিঃসাড় করে রাখে । কবির মতে, যথার্থ সংশয়ের বেদনা তখনই জেগে ওঠে যখন ঈশ্বর গোপনভাবে আমাদের চৈতন্যের কোনো এক দিকে স্পর্শ করেন। তখন আমরা বুঝতে পারি যে, প্রেম ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। জ্ঞান বা দর্শনের তর্কে নয়, বরং 'প্রেম-আলোকে প্রকাশো জগপতি হে'—এই প্রার্থনার মাধ্যমেই সংশয়ের অন্ধকারের অবসান ঘটে ।
ঈশ্বরের এই অভাব বা প্রেমাভাবকে রবীন্দ্রনাথ 'অভাব' প্রবন্ধে এক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও অন্তরঙ্গ স্বপ্নের বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বাল্যকালে মাতৃহীন কবি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছেন এবং গঙ্গার ধারের বাগানবাড়িতে তাঁর মা একটি ঘরে বসে আছেন। কবি প্রথমে মায়ের প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো—মা আছেন। তখনই তিনি ঘরে গিয়ে মায়ের পায়ে ধুলো নিয়ে প্রণাম করলেন, আর মা তাঁর হাত ধরে বললেন, "তুমি এসেছ!" । এই স্বপ্নটিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে কবি বলেছেন যে, এই সংসারে ঈশ্বর অন্ন-জল দিয়ে আমাদের পালন করছেন ঠিকই, তাঁর ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত, কিন্তু মন যতক্ষণ সম্পূর্ণ জেগে উঠে সেই পরম সত্তাকে না চায়, ততক্ষণ সেই স্বরটি, সেই স্পর্শটি পাওয়া যায় না যেখানে তিনি হাত ধরে বলবেন— "তুমি এসেছ!" । জগতে জন্মেও জগতের সাথে বা পরম আত্মীয়ের সাথে মানুষের এই যে অব্যবহিত সংস্পর্শের অভাব, এটিই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
এই অভাব পূরণের উপায় হলো 'আত্মার দৃষ্টি' উন্মোচন করা। কবি তাঁর বাল্যকালের ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির উদাহরণ টেনে বলেছেন, যেমন চশমা পরলে হঠাৎ চারপাশের জগৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বিশ্বভুবনকে নতুন করে পাওয়ার আনন্দ লাভ হয়, তেমনি আত্মা দিয়ে দেখারও একটি দৃষ্টি আছে । আমরা প্রতিদিন জল, বায়ু, চন্দ্র, সূর্যের মতো পরম বন্ধুদের কাছ থেকে উপকার গ্রহণ করি, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত সত্তাকে অনুভব করি না। মানুষের অস্ফুট চেতনার এই ডিমের ভেতর থেকে জন্মলাভই হলো আধ্যাত্মিক জন্ম, যার দ্বারা মানুষ 'দ্বিজ' হয় । এই আত্মার দৃষ্টি যখন উন্মোচিত হয়, তখন মানুষ ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধির দ্বারা নয়, বরং নিজের সত্তার দ্বারাই জগতের সমস্ত সত্তাকে অনুভব করে। উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে— "তে সর্বগং সর্বতঃ প্রাপ্য ধীরা যুক্তাত্মানং সর্বমেবাবিশন্তি", অর্থাৎ ধীর ব্যক্তিরা সর্বব্যাপীকে সকল দিক থেকে পেয়ে যুক্তাত্মা হয়ে সর্বত্রই প্রবেশ করেন । এই সর্বত্র প্রবেশ করার ক্ষমতাই হলো আত্মার শেষ ক্ষমতা, যেখানে আমিত্বের আবরণ ভেদ করে নিখিলের আলো স্ফুটতর হয়ে দেখা যায়।
আধ্যাত্মিক এই যাত্রাপথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো 'পাপ' এবং 'দুঃখ'। 'পাপ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ পাপকে কোনো সামাজিক ভদ্রতার অভাব বা আইনি অপরাধ হিসেবে দেখেননি; তাঁর মতে, পাপ হলো চরম মিলন ও পরম প্রেমের পথে এক সুদুর্ভেদ্য বাধা । বাইরের রাস্তা পরিষ্কার করলেও অন্তরের গভীরে স্বার্থপরতা ও সংস্কারের যে সূক্ষ্ম শিকড়গুলো জড়িয়ে থাকে, আধ্যাত্মিক চাষ-আবাদে সেগুলো পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে। আত্মা যখন পরমাত্মাকে চায়, তখনই সে পাপের এই নিগড়কে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে এবং সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে বলতে বাধ্য হয়, "বিশ্বানি দুরিতানি পরাসুব"—সমস্ত পাপ দূর করো ।
অন্যদিকে, 'দুঃখ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ দুঃখকে জীবনের অভিশাপ হিসেবে না দেখে, ঈশ্বরের এক প্রকার রুদ্ররূপী আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছেন। উপনিষদের মন্ত্র "নমঃ সম্ভবায় চ ময়োভবায় চ"-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ঈশ্বর কেবল সুখকর নন, তিনি কল্যাণকর এবং সেই কল্যাণের পথ অনেক সময়ই দুঃখকর হতে পারে । ধনী বিলাসী ব্যক্তি আরামের আবরণে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে যেমন নিজের শক্তিকে পঙ্গু করে ফেলে, তেমনি দুঃখকে এড়িয়ে চললে মানুষ সত্যের পূর্ণ সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়। দুঃখের দহন ছাড়া মানবচরিত্রের অসারতা দূর হয় না এবং অন্তরের প্রকৃত ঐশ্বর্য লাভ করা সম্ভব হয় না । ঈশোপনিষদের ত্যাগের আদর্শকে ধারণ করে কবি বিশ্বাস করতেন যে, বস্তুগত সঞ্চয়ের মধ্যে মানুষের সার্থকতা নেই; তার সার্থকতা রয়েছে নিজের ক্ষুদ্র অহংকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথের এই আধ্যাত্মিক ভাবনায় প্রকৃতি কোনো জড় পদার্থ নয়; এটি পরমেশ্বরের এক সজীব, ছন্দোময় ও স্পন্দিত প্রকাশ। 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালায় ঈশ্বরচিন্তার সাথে প্রকৃতিদর্শনের যে অপূর্ব সংলাপ তৈরি হয়েছে, তা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে বিরল। নবম খণ্ডে সংকলিত 'তপোবন' ও 'আশ্রম' প্রবন্ধ দুটিতে এই দর্শনের চূড়ান্ত রূপ লক্ষ করা যায় । প্রাচীন ভারতের তপোবনগুলো কেবল বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র ছিল না, সেগুলো ছিল মানুষের সাথে প্রকৃতির এক নিবিড় আত্মীয়তা স্থাপনের পবিত্র স্থান । রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে, আধুনিক যুগের ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা—যা চারদেয়ালের মধ্যে বন্দি, যান্ত্রিক এবং প্রাণহীন—তা শিশুদের আত্মাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে । তাঁর ভাষায়, এই শিক্ষাব্যবস্থা হলো "education factory, lifeless, colourless, dissociated from the context of the universe" । এই কারণেই তিনি শান্তিনিকেতনের শিক্ষা কার্যক্রমকে উন্মুক্ত আকাশের নিচে, বৃক্ষতলে স্থাপন করেছিলেন, যেখানে শিশুরা প্রকৃতির কোলে আনন্দ ও স্বাধীনতার সাথে জ্ঞানার্জন করতে পারে ।
রবীন্দ্রনাথের মতে, প্রকৃতির ঋতুচক্র, দিন ও রাত্রির আবর্তন—এসব কিছুর মধ্যেই ঈশ্বরের নিঃশব্দ পদচারণা রয়েছে। 'দিন' ও 'রাত্রি' শীর্ষক প্রবন্ধগুলিতে তিনি প্রকৃতির এই দুই বিপরীত রূপের মধ্যে জীবনের আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সন্ধান করেছেন । দিনের কোলাহল ও কর্মচাঞ্চল্যের পর রাত্রি যেমন বিশ্বকে এক গভীর প্রশান্তির চাদরে ঢেকে দেয়, তেমনি জীবনের সমস্ত কর্মের শেষে ঈশ্বরের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যেই রয়েছে পরম শান্তি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকলে মানুষের মন থেকে কৃত্রিমতা দূর হয় এবং সে এক বিশালত্বের স্বাদ পায়, যাকে ছান্দোগ্য উপনিষদে 'ভূমা' বলা হয়েছে । 'ভূমা' প্রবন্ধে কবি স্পষ্ট করেছেন যে, ক্ষুদ্রের মধ্যে মানুষের কোনো তৃপ্তি নেই; অনন্তের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ ও মুক্তি। প্রকৃতির অসীম আকাশ, উন্মুক্ত প্রান্তর এবং অবারিত আলো-বাতাস মানুষকে সেই 'ভূমা'র সাথে পরিচিত করে। তাই শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের উৎসব বা নববর্ষের উৎসব কোনো মানবসৃষ্ট কৃত্রিম আচার নয়, বরং তা প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দের সাথে মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনকে মিলিয়ে দেওয়ার এক আধ্যাত্মিক আয়োজন ।
'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী দিক হলো এর 'বিশ্ববোধ' বা মানবধর্মের ধারণা। দশম খণ্ডের 'বিশ্ববোধ' এবং সপ্তম খণ্ডের 'ব্রহ্মবিহার' প্রবন্ধে কবি মানুষের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, বর্ণভেদ বা গোষ্ঠীগত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র মানবজাতির সাথে একাত্ম হওয়ার কথা বলেছেন । শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মূল মন্ত্রই হলো "যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্"—যেখানে সমগ্র বিশ্ব একটিমাত্র নীড়ে এসে মিলিত হয় । বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন সমগ্র বিশ্ব উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদের লোভ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলায় উন্মত্ত, তখন রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের এই নিভৃত প্রান্তর থেকে সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্বপ্রেমের বাণী প্রচার করেছিলেন । তিনি তাঁর ভাষণে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সীমারেখা মানুষের আত্মার সীমানা হতে পারে না। বৌদ্ধ দর্শন এবং উপনিষদীয় চেতনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি সর্বভূতে মৈত্রী ও করুণা বিস্তারের কথা বলেছেন । মানুষের মুক্তি কেবল অরণ্যে বসে ধ্যানের মধ্যে নয়; 'জগতে মুক্তি' ও 'সমাজে মুক্তি' প্রবন্ধে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, সমাজ ও সংসারের সেবামূলক কর্মের মাধ্যমেই প্রকৃত আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব ।
রবীন্দ্র-গবেষক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালার ঐতিহাসিক ও দার্শনিক গুরুত্ব অপরিসীম। অজিতকুমার চক্রবর্তী, যিনি শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন, তিনি কবির শিক্ষাদর্শ ও আধ্যাত্মিক চিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত । অজিতকুমার গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর নিছক কোনো নৈর্ব্যক্তিক বা বিমূর্ত শক্তি নন, বরং তিনি এক 'প্রেমময় পুরুষ' বা 'মনের মানুষ', যাঁর সাথে মানুষের সম্পর্ক গভীর ভালোবাসার। অন্যদিকে, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ নীহাররঞ্জন রায় তাঁর 'অ্যান আর্টিস্ট ইন লাইফ' এবং অন্যান্য রচনায় রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে তাঁর আত্মিক সংযোগের বিষয়টি সুচারুরূপে বিশ্লেষণ করেছেন । নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের ধ্রুপদী মূল্যবোধকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে তুলেছিলেন এবং এই প্রবন্ধমালাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আধুনিক গবেষক মেধা ভট্টাচার্য তাঁর ইংরেজিতে অনূদিত 'Rabindranath Tagore's Śāntiniketan Essays: Religion, Spirituality and Philosophy' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথ কীভাবে উপনিষদ, বৌদ্ধধর্ম, বৈষ্ণববাদ এবং বাংলার বাউল দর্শনের নির্যাসকে একীভূত করে তাঁর নিজস্ব উদার ও অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিক ভাষা নির্মাণ করেছেন । নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও উল্লেখ করেছেন যে, পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন দূরবর্তী রহস্যবাদী (mystic) সাধক হিসেবে দেখার যে ভুল প্রবণতা রয়েছে, তা তাঁর বহুমুখী দার্শনিক ও সমাজচিন্তাকে আড়াল করে দেয়; অথচ শান্তিনিকেতনের মতো রচনায় তাঁর প্রখর বাস্তববোধ, সৃজনশীল শিক্ষাচিন্তা এবং সার্বজনীন দর্শনেরই স্ফুরণ ঘটেছে ।
একুশ শতকের এই প্রবল বস্তুবাদী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভোগবাদী সভ্যতায় দাঁড়িয়ে আজকের দিনের পাঠকের কাছে 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালার প্রাসঙ্গিকতা আগের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের মানুষ প্রতিনিয়ত যে মানসিক চাপ, আত্মপরিচয়ের সংকট, এবং প্রকৃতির সাথে বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় ভুগছে, তার এক শান্তিময় ও শাশ্বত সমাধান লুকিয়ে আছে এই প্রবন্ধগুলির পাতায় পাতায় । আজ যখন ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত এবং উগ্র জাতীয়তার নামে পৃথিবীজুড়ে বিভেদ ও সংঘাতের প্রাচীর তোলা হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের 'বিশ্ববোধ' ও 'ব্রহ্মবিহার' আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের চরম ও পরম পরিচয় তার মানবসত্তায়। আজ যখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে, তখন কবির সেই 'তপোবন' দর্শন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, প্রকৃতির ওপর নির্মম প্রভুত্ব করা নয়, বরং প্রকৃতির সাথে একাত্ম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে বেঁচে থাকাই মানবসভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র টেকসই পথ ।
এই প্রবন্ধমালা আজকের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি থেকে পাঠককে একটি নিভৃত আত্মানুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানায়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে কোলাহলের মাঝেও নিজের অন্তরের শান্তিনিকেতনটিকে সুরক্ষিত রাখতে হয়। এটি বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কেবল বস্তুগত সঞ্চয়ের পাহাড় গড়ে তুললেই জীবন সার্থক হয় না, বরং ত্যাগের মাধ্যমে, প্রেমের মাধ্যমে এবং সর্বভূতে নিজের আত্মাকে প্রসারিত করার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত অর্থে 'অমৃতের পুত্র' হয়ে উঠতে পারে । ২০২৩ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক শান্তিনিকেতনকে 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট' বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তা বস্তুত কোনো ইটের ইমারতের স্বীকৃতি নয়; তা হলো রবীন্দ্রনাথের এই সার্বজনীন, প্রকৃতি-সংলগ্ন ও আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনেরই এক বিশ্বব্যাপী জয়গান ।
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালা বাংলা গদ্যসাহিত্যের এমন এক দুর্লভ ও অমূল্য রত্নভাণ্ডার, যেখানে উপনিষদের উচ্চমার্গীয় ও প্রাচীন দর্শন কবির মরমী অনুভূতির ছোঁয়ায় এক নতুন ও সজীব প্রাণ লাভ করেছে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যে নির্জন আশ্রমের বীজ বপন করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কর্ম, প্রেম ও দার্শনিক প্রজ্ঞার বারি সিঞ্চনে তাকে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত করেছিলেন, যার ছায়ায় আজ সমগ্র বিশ্বের ক্লান্ত মন আশ্রয় খোঁজে। এই প্রবন্ধগুলিতে ঈশ্বর কোনো ভীতি-জাগানিয়া বিচারক নন, তিনি প্রেমময় বন্ধু এবং জীবনের চিরন্তন সঙ্গী। এখানকার আধ্যাত্মিকতা সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর শুষ্ক বৈরাগ্য নয়, বরং তা হলো সংসারের সকল দায়িত্ব, সকল দুঃখ ও আনন্দকে পরম সত্তার আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করার মন্ত্র। 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালা তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা সম্প্রদায়ের পাঠ্য নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির আত্মিক মুক্তির এক কালজয়ী ইশতেহার। এটি এমন এক আলোকময় পথপ্রদর্শক, যা যুগে যুগে মানুষকে তার ক্ষুদ্রতার গণ্ডি পার হয়ে অনন্ত সত্য, শিব ও সুন্দরের দিকে অবিরাম যাত্রা করার সাহস জোগাবে।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল। মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গাছ
চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল। সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।