২৭ জুলাই, ২০২৬
অপরাহ্নের পর
অপরাহ্নের পর
কিছু দুপুর আছে, বিকেলের আগেই শেষ হয়ে যায়। জানালার পাশে বসে টের পাই। রোদটা ধীরে ধীরে দেয়াল বেয়ে ওঠে, তারপর হারিয়ে যায়। ওই সময় কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না। বই খুলে বসি, দুই পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর খেয়াল করি দশ মিনিট ধরে একই লাইনের দিকে তাকায়ে আছি। শব্দগুলো চোখে ঢুকছে, মাথায় ঢুকছে না। অভিমান করেছে ভাষা।
 
অমন সময় শহরের পুরনো জায়গাগুলাতে ফিরতে ভাল লাগে। নতুন ক্যাফে, নতুন রেস্টুরেন্ট, নতুন সাজসজ্জা খুব একটা টানে না। সেই চায়ের দোকানে যাই, যার বেঞ্চিটার একপাশ একটু নিচু। সেই বইয়ের দোকানে ঢুকি, যেখানে মালিক এখনো প্রতিবার জিজ্ঞেস করে, নতুন কবিতার বই লাগবে?
 
– তুমি কি নস্টালজিয়াকে রোমান্টিসাইজ করো?
– হতে পারে। 
তারপর চুপচাপ। সব কথার উত্তর দিতে হয় না। কিছু কথা বাতাশে ছেড়ে দেয়াই ভালো। বাতাশেরও নিশ্চয়ই আর্কাইভ আছে। সেখানে আমাদের না বলা কথাগুলো জমে থাকে।
 
রিভারভিউয়ে পুরনো বিল্ডিংয়ের পাশে একটা কোণা ছিল। বিকেলের দিকে ওর সামনে ছেলেরা খেলতো। আমরা বন্ধুরা ওর সামনে বসে থাকতাম। তখন মনে হতো পৃথিবীটা খুব সহজ। এখন বুঝি, পৃথিবী কঠিন ছিল, আর আমরা সহজ।
 
কিছুদিন আগে আবার ওই স্কুল মাঠে গেলাম। বিল্ডিংগুলো নতুন। উন্নয়নের চাপে অস্বস্তি হচ্ছিলো। মনে হলো, জায়গাটা আমাকে চিনতে পারছো না। অথচ আমি স্পষ্ট চিনতে পারছিলাম কোন ছাদের নীচে বসে একদিন আমরা অকারণে হেসেছিলাম, কোন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখেছিলাম। মানুষ বদলায়, ভবন বদলায়, রঙ বদলায়, কিন্তু মাথার ভেতরে দৃশ্য আশ্চর্য জেদ নিয়ে বসে থাকে।
 
আজকাল মানুষের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ কমে গেছে। অথচ মানুষের গল্প শুনতে এখনও ভাল লাগে। রিকশাওয়ালার গল্প, বই বিক্রেতার গল্প, ফুটপাতে চা বিক্রেতার গল্প। এগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়, আমরা সবাই একই নদীর ভিন্ন ভিন্ন স্রোত। কারও পানি একটু ঘোলা, কারও একটু স্বচ্ছ। কিন্তু শেষপর্যন্ত সবার ভাটির দিক এক।
 
রাতে বাসায় ফিরে বাড়ির সামনে দাঁড়াই। সামনের রাস্তা ধরে কয়েকটা কুকুর হাঁটে। একটা ঘরে টেলিভিশন শব্দ করে হাসে। কোথাও প্রেসার কুকার চিৎকার করে ওঠে। এইসব খুব সাধারণ ঘটনা। তবু এই সাধারণতার ভেতরেই কেমন বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকে। এইসব অগণিত ছোট ছোট অভ্যাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবী। কোনো একদিন যদি হঠাৎ সব অভ্যাস হারিয়ে যায়, হয়তো মানুষ নিজের নামও ভুলে যাবে।
 
ঘরে ঢুকে বাতিটা নিভায়ে দিই। অন্ধকারে বসে থাকি কিছুক্ষণ। জীবনে খুব বড় কোনো অলৌকিক ঘটনার দরকার ছিল না। দরকার ছিল এমন দু একজন মানুষ, যাদের সামনে নিশ্চিন্তে চুপ করে বসে থাকা যেত। কথা না বললেও যারা বুঝত, এই নীরবতারও একটা ভাষা আছে।
 

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
ভবেশ বসু

আমার রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল।  মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

গদ্য৭ মে, ২০২৪
রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
সব্যসাচী হাজরা

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গদ্য৩০ আগস্ট, ২০২৪
 গাছ
হিমাংশু রায়

গাছ

চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল।  সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।

গদ্য৭ মে, ২০২৪