
অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।
একা থাকলে যেমন হয় ঘরের অবস্থা।চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বই, ফ্ল্যাগ, খবরের কাগজ ইত্যাদি। সরমা, মৈনাকের বৌ, হেসে বলল,
- " একা থাকলে এমনই হয়। "
রীয়াংশু কোনো উত্তর দিল না। মুখ ভর্তি দাড়ির মধ্যে থেকে হালকা হাসি হেসে শোফায় বসে কিছু একটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল পেপারের মধ্যে। মনে হলো কোনো ছবি। সারাদিনের জার্নির ক্লান্তি আর শরমার বকবকানি শুনতে শুনতে মৈনাকের শরীর ক্লান্ত। মুখে হাতে জল দিয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লো।
রীয়াংশু যখন মৈনাককে ডাকল, তখন সন্ধ্যা সাতটা। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল টের পাইনি। রীয়াংশু বলল,
- " ওঠ্, তাড়াতাড়ি মুখে জল দিয়ে আয়, গরম গরম পকোড়া আর বৌদির হাতের চা, জমিয়ে খাওয়া যাবে। "
মৈনাক চোখ ছাড়াতে পারছিল না, তাই উবু হয়ে আবার বালিশটা বুকে চেপে ঘুমাতে যাবে, এমন সময় সরমা চিৎকার করে বলে উঠল,
- " এখানে কি ঘুমাতে এসেছ? ঘুমাতে যদি হয় তো জলখাবার খেয়ে আমাকে উদ্ধার করে ঘুমাও। "
সরমার বলার মধ্যে একটা মিষ্টতা আছে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মৈনাক উঠে পড়ল। চোখ মুখ ধুয়ে একসাথে চায়ের আড্ডায় তুফান তোলার পর রীয়াংশু বলল,
- " আমার কল হয়ে গেছে, আমাকে ডিউটি যেতে হবে। "
এই বলে ও গোছগাছ শুরু করে দিল। মৈনাক ওর ওয়ার্কিং টাইম টেবিল এর মোটা বইটার পেজ গুলো উল্টে পাল্টে দেখতে থাকল। একবার কৌতূহল বশতঃ ডাক ছেড়ে বললো,
- " বইটা পুরো পড়েছিস? "
রীয়াংশু বলল,- " হ্যাঁ। "
- " আমাকে একটু বলবি এর বিষয়বস্তু কী! "
ইয়ার্কির ছলে উত্তর এলো,
- " ওসব পড়ে তোর কাজ নেই। সরমার মনটা ভালো করে পড়।"
তারপর সাদা জামা প্যান্ট পরে, পিঠে বড়ো ব্যাগ, আর হাতে একটা বড়ো ব্যাগ নিয়ে বললো,
- "এই, আমি আসলাম। আমার ফিরতে সকাল হয়ে যেতে পারে।"
শরমা ছুটে এসে রীয়াংশুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
- "তোমাকে পুরো সাদা সাহেব লাগছে।"
রীয়াংশু এবার জোরে না হেসে পারল না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মৈনাক দেখল, রীয়াংশু তখনও ফেরেনি। তাই সে চা খেয়ে, সরমাকে আসছি বলে, বাইরে ঘুরতে বের হয়ে গেল। আগে কয়েকবার এসেছে বলে, জায়গাটা মোটামুটি জানা আছে। আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শপিংমল, ফ্ল্যাট ফাঁকা জায়গা গুলোকে গ্রাস করে ফেলেছে। সামনের বাজারে বড়ো বড়ো পাবদা মাছ দেখে রীয়াংশুর কথা মনে পড়ে গেল মৈনাকের । কারণ ওর প্রিয় খাবারের তালিকার মধ্যে অন্যতম হলো সরমার হাতে তৈরি পাবদা মাছের কালিয়া। তাই রীয়াংশুকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বড়ো দেখে দুটো মাছ নিয়ে নিল। দুপুরে খেতে বসে মৈনাক মজার ছলে বলল,
- "এবার একটা বিয়ে কর। কতদিন পরের বৌয়ের হাতে মাছের কালিয়া খাবি! "
মৈনাকের বৌও কম যায় না, হেসে বলল, - " বিয়ে করেনি বলেই আমার রান্নার কদর আছে, মাঝে মাঝে আসতে পারি। বিয়ে করলে তো ভুলেই যাবে।"
রীয়াংশু কোনো উত্তর না দিয়ে ক্ষনিকের জন্য খাওয়া বন্ধ করে আবার খেতে শুরু করল। সরমা বলে উঠল,
- "আমি কি কিছু ভুল বলে ফেললাম নাকি! "
রীয়াংশু- " না! না!"
মৈনাক বলল-"তোকে একটা কথা বলার আছে। আসা থেকে দেখছি তোর মনটা ঠিক নেই। কথা কম বলছিস। মুখে একগাল দাড়ি। কিছু হয়েছে রে!"
রীয়াংশু এড়িয়ে গিয়ে বলল- "দাঁড়া তোদের জন্য... "
এই বলতে বলতে উঠে গেল। তারপর ব্যাগ থেকে কিছু টাটকা লাল গোলাপ নিয়ে হাতে দিয়ে বলল,
- "তোরা হয়তো ভুলে গেছিস, আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন ডে। ভালোবাসাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখ, সবার কপালে এসব জোটে না।"
রীয়াংশুর আবেগতাড়িত কথাগুলো শুনে সরমা আর মৈনাকের দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
রীয়াংশু - "সারা রাত গাড়ির ঝাকানি খেয়ে শরীর পুরো ক্লান্ত, আমি শুতে চললাম। সন্ধ্যায় উঠতে পারলে কথা হবে, না হলে সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে।"
এই বলে রীয়াংশু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
সরমার মনটা দুপুর থেকে অস্থির। ওর খুব জানার ইচ্ছা কী জন্য রীয়াংশুর মতো ছেলে এভাবে স্থির হয়ে গেল। কারণ সরমা ওকে প্রথম থেকেই দেখে এসেছে ছটফটে, হাসি মজায় কাটানো ছেলে হিসেবে। তাই রীয়াংশুর এই স্থিরতা নিয়ে সরমার মনে হাজার কৌতুহলী প্রশ্নের বাসা বাধতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা হতেই শরমা রীয়াংশুর ঘরের দরজায় টোকা মারতে শুরু করল। রীয়াংশু তাড়াতাড়ি দরজা খুলে চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
- " আরে বাবা! এতো তাড়াতাড়ি সকাল হয়ে গেছে!"
শরমা ওর চোখ মুখ দেখেই বুঝল ও ঘুমায়নি, নাটক করছে।
শরমা বলল- "মুখ ধুয়ে এসো। চা বানাচ্ছি।"
রীয়াংশু দু মিনিটের জন্য দরজা বন্ধ করে ড্রেস চেঞ্জ করে বাইরে এলো। আসলে ড্রেস চেঞ্জ ছিল বাহানা। কিছু জিনিস পত্র সরিয়ে এলো। যা নিয়ে সারা বিকেলটা কাটিয়েছে। সরমা চায়ের কাপটা হাতে দিয়ে তড়িৎ বেগে বলল,
- " এবার না লুকিয়ে তোমার ইতিহাসটা খুলে বলো, কারণ তোমার ভূগোলটা অন্য কথা বলছে। "
রীয়াংশু আর চুপ থাকল না। মনটাকে ফ্রি করার জন্য প্রথম থেকে সব একে একে বলতে থাকল।
রীয়াংশুর ভাষায়-
"ট্রেন ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে আমাকে নানান জায়গায় গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। যেতে যেতে পাহাড়, নদী, ভোরের আকাশ, সূর্যাস্ত, ইত্যাদি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার খুব ভালো লাগে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে রাতের নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে মাঠ জুরে শিয়ালের ডাক আরও ভালো লাগে। এর আগে শিয়ালের ডাক শুনিনি , এই জবে এসে এদের সাথে পরিচয় হয়েছে। কখনও কখনও চোখেও পড়ে। গভীর রাতে গাড়ি দাঁড়ালে বাইরে বের হয়ে দেখি, প্রকাণ্ড আকাশের বুকে তারাদের মিটিমিটি হাসি। দিনের বেলায় যখন লাইন ধরে এগিয়ে চলি তখন বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হাত নাড়িয়ে টাটা দেওয়া আমার মন কেড়ে নেয়। কত হাসি খুশি মন নিয়ে ,ধুলো লাগা হাফ প্যান্ট পরা ছেলে মেয়েগুলো বিদায় সম্ভাষণ জানায়। ছোটবেলা মনে পড়ে যায়। তবে এদের মতো এতো আনন্দময় ছোটো বেলা আমার ছিল না। অল্প বয়সে বাবা মাকে হারিয়ে জীবন থেকে প্রায় সব আনন্দই হারিয়ে গিয়েছিল।
আমি গুডস ট্রেন ম্যানেজার হওয়ায় আমাকে পিছনে থাকতে হয়। "
সরমা বলে উঠল- "পিছনে কেন? "
রীয়াংশু - "বাড়ির অভিভাবক যেমন সবাইকে সামনে এগিয়ে দিয়ে নিজে পিছনে থেকে সবাইকে দায়িত্ব সহকারে নিয়ে যান, ঠিক আমাকেও সেজন্য পিছনে থাকতে হয়।"
সরমা মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে,চুপ হয়ে গেল।
রীয়াংশু - " প্যাসেঞ্জার ট্রেন, মেল, এক্সপ্রেস চালানোর জন্য গুডস্ ট্রেনকে লুপ লাইনে অথবা মেন লাইনে রেখে দেয়। এমনই একদিন আমার গাড়ি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল 'তিনপাহাড় এ' । এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। গগনচুম্বী পাহাড়, আশেপাশে ছোটো ছোটো খেজুর গাছের সারি, পাথরের ঢিবি, সব মিলেমিশে এক অপরূপ পরিবেশ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে মনের মধ্যে যেসব শব্দগুলো বিচরণ করে যাচ্ছিল, সেগুলো লিখতে থাকলাম Caution paper এর পিছনে ফাঁকা জায়গায়। কখন যে পাশ দিয়ে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে গেল বুঝতেই পারলাম না।
হুঁশ ফিরলো নুপূরের শব্দ শুনে। অবাক লাগলো, একটি মেয়ে ব্রেক ভ্যানে উঠে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। প্ল্যাটফর্ম লেভেলে ব্রেক ভ্যান থাকায় উঠতে অসুবিধা হয়নি। নীল শাড়ি, নীল ব্লাউজ এককথায় যা কিছু পড়ে আছে সবই নীল। মনে হলো আকাশ তার সব নীল ঢেলে দিয়েছে মেয়েটির শরীরে। আমার সামনে এসে ভদ্রতা সুলভ ভঙ্গিতে কাঁচুমাচু হয়ে বললেন ,
- "ম্যানেজার সাহেব, আমার গাড়িটা মিস হয়ে গেছে, আমাকে একটু নিয়ে যাবেন! আমার খুব তাড়া আছে, আজ স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষা। ঠিক সময়ে পৌঁছাতে না পারলে হেডমিস্ট্রেস খুব বিরক্ত হবেন।'
আমি ইতস্ততঃ হয়ে বলতে গেলাম যে,
- 'আমাদের ব্রেক ভ্যানে কাউকে এলাউ.....! '
কথাটা শেষ করার আগেই মেয়েটি বললেন,
-'প্লীজ না বলবেন না, তাহলে সমস্যায় পড়ে যাব।'
এমন সময় ড্রাইভার সাহেব বললেন,
-' ম্যানেজার সাহেব, স্টাটার সিগন্যাল অফ হলো।'
আমি গাড়ি স্টার্ট করার পারমিশন দিয়ে রাফ জার্নালে টাইম লিখতে প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় এক ঝটকায় মেয়েটি ব্যালেন্স রাখতে না পেরে আমার গায়ের উপর পড়ে ,শক্ত করে কাঁধটা ধরে ফেললো। মেয়েটি সরি বলে উঠে দাঁড়াল। আমি মেয়েটিকে খুব সাবধানে এগিয়ে গিয়ে উল্টো দিকের সীটে বসতে বললাম। মেয়েটি ধন্যবাদ জানিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বসলেন। তারপর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমার কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করতে থাকলেন। আমার All Right exchange , CTR লেখা, walkie talkie তে Station Master, Driver সাহেবের সাথে কথা বলা ইত্যাদি দেখার পর ,জড়তা কাটিয়ে মুখ খুললেন,
- 'আপনাদের কাজে চাপ আছে। আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষ বাইরে থেকে যেটা ভাবি সেটা একেবারেই ভুল ধরনা।'
আমি মৃদু হেসে বললাম, - 'শুধু এটুকু না আরও অনেক দায়িত্ব আছে, paper check,Speed restriction, abnormality face, দায়িত্ব সহকারে goods/passenger দের পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি। রাত -দিন,জল ঝড়, রোদ , তাপ, সাপ, এমনকি নির্জন জায়গায় লম্পটদের অত্যাচারকে উপেক্ষা করে, প্যাসেঞ্জারদের সময়ের গুরুত্ব কে মাথায় রেখে, সৈনিকদের মতো এগিয়ে যেতে হয় Destination এ।'
মেয়েটির কোনো সাড়া না পেয়ে, পিছন ঘুরে দেখি এক চোখে রুমাল দিয়ে চেপে ধরে বসে আছে। আমি বুঝতে পেরে বললাম -' চোখে ধূলো পড়েছে? '
মেয়েটি বলল,-' হুম্ '।
আমি বললাম - ' দরজাটা খুলতে গেলেন কেন?'
যখন দেখলাম দুচোখ দিয়ে জল আসছে, ঠিকঠাক চোখ চাইতে পারছে না, তখন অগত্যা উঠে গিয়ে চোখের পাতা টেনে দেখতে থাকি। প্রথমে সংকোচ লাগছিল। চোখের পাতা টেনে দেখার সময় ওর কোমল মুখের স্পর্শ আজও মনে পড়ে। শাড়ির আঁচলটা হাওয়ায় উড়ে এসে মুখে পড়তে, মুখ মোছা আঁচল হতে কস্টিউমের সুগন্ধ ঢুকে গেল নাকের ভিতর। সত্যিই সে এক আলাদা অনুভূতি। তাঁর গন্তব্য স্টেশন আসতে ড্রাইভার সাহেবকে গাড়ি স্লো করতে বলে নেমে যেতে বললাম। কিন্তু চলন্ত গাড়িতে নামা সকলের দ্বারা সম্ভব না। তাই প্ল্যাটফর্ম লেভেলে আসতে হাতটা ধরেই নামিয়ে দিলাম। মেয়েটি ধন্যবাদ জানিয়ে আমার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার গাড়ি ধীরে ধীরে স্পিড নিতে শুরু করল। দুজনের মধ্যে দূরত্বও বাড়তে শুরু করল। যেন মনে হলো গভীর ঘুমের মধ্যে কোনো নাম না জানা পরি এসে স্বপ্নে উঁকি মেরে গেল।
তবে মনের মধ্যে মেয়েটি একটা গভীর দাগ কেটে গেল। সেই দাগটা আরো গভীর হলো সরস্বতী পূজার কয়েকদিন আগে। সেদিন ঐ রুটেই গাড়িটা লুপ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমার পেপারের কাজ সেরে একটা সিগারেট ধরিয়ে ব্রেক ভ্যানের বাইরে হাওয়ায় এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলাম। কিছুটা দূরেই গ্রামের ঢালাই রাস্তা থেকে কয়েকজন ছোটো ছেলেমেয়ে বলে উঠলো, - ' ম্যানেজার সাহেব সরস্বতী পূজার চাঁদা দেবেন। '
আমি ততটা গুরুত্ব না দিয়ে উল্টোদিকে মুখ করে সিগারেট টানতে থাকলাম। কানে এলো -'ম্যাডাম পূজার চাঁদা দেন, চাঁদা দেন।'
ঘুরে দেখি স্কুটিতে চেপে থাকা কোনো ভদ্রমহিলা কে বাচ্চাগুলো ঘিরে ধরেছে। ম্যাডাম তাদের কে শান্ত হতে বললেন। তারপর বাচ্চা গুলো একটু দূরে সরে দাঁড়াতে দেখি, সেই চেনা মুখ। মেয়েটি মাথা তুলে একবার দেখেই মৃদু হাসলেন। আমি তৎক্ষণাৎ হাতের জলন্ত সিগারেটটা লুকিয়ে ফেলি। আমি হেসে বললাম, - ' ভালো আছেন ম্যাডাম?' কোনো উত্তর এলো না, শুধু হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ালেন।তারপর চাঁদা না দিয়ে বাচ্চাগুলোকে ডেকে কি যে বলে চলে গেলন, তখন বুঝতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম একটু পরে, যখন সবাই হুড়োহুড়ি করে ব্রেক ভ্যানে উঠে পড়লো। আমি অবাক হয়ে গেলাম।
- 'কী হলো? কী হলো?'
বলতেই বাচ্চাগুলো বলল,
' ম্যাডাম বলেছেন দুজনের চাঁদা আপনি দেবেন। এও বলেছেন আপনার কাছে ম্যাডামের টাকা রাখা আছে, বললেই দিয়ে দেবেন।'
আমি হতবাক হয়ে গেলাম। কতটা আপন হলে তবেই এই কথাগুলো সাহস করে বলা যায়। হতবাক হলেও মনে মনে খুব খুশি হয়ে ছিলাম। দুটো একশো টাকার নোট বের করে বললাম,
- ' একটা ম্যাডামের, আরেকটা আমার।'
বাচ্চারাও খুব খুশি হয়ে নাচতে নাচতে চলে গেলো। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার নতুন অধ্যায় শুরু হলো।আনন্দে আরো একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে লাগলাম, হঠাৎ পরিচয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে একজন মানুষ কতটা তাড়াতাড়ি আপন হয়ে উঠতে পারে।
এর পর আমরা কয়েকবার দেখাও করেছিলাম।চিঠির আদান- প্রদান হয়েছিল। শেষবার দেখা হয়েছিল একদিন লেভেল ক্রসিং গেটের কাছে, গাড়ি শান্টিং করানোর সময়। তখন গাড়ি খুব ধীরে ধীরে চলছিল। ব্রেক ভ্যানের বাইরে দাঁড়িয়ে পয়েন্ট আর শান্ট সিগন্যাল লক্ষ্য করছিলাম। কাজের মধ্যে থাকলেও, গেটের দুদিকে আটকে থাকা অপেক্ষারত মানুষগুলোর দিকে চোখ অজান্তেই চলে যায়। তাঁদের মধ্যেও একটা কৌতূহল থাকে কি কাজ চলছে, ম্যানেজার সাহেব কি করছে,ওয়াকি টকি তে কি কথা বলছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। সর্বোপরি বলা যায় এই সাদা ড্রেসটার প্রতি একটা আলাদা ইন্টারেস্ট থাকে অনেকের।
তেমনই আমার চোখ চলে গিয়েছিল মানুষগুলোর দিকে। হঠাৎ দেখলাম একদম লিফ্টিং বেরিয়ারের গোড়ার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে প্রিয় মানুষটি। কাঁধে ঝোলানো আছে কাপড়ের ব্যাগ। যেমনটা আগেকার দিনে শিক্ষকরা ব্যবহার করতেন। সাদা শাড়ির উপর ব্রাউন রেখা, আর ব্রাউন ব্লাউজে অসাধারণ লাগছিল। তবে মুখটা খুব ভার করে দাঁড়িয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওর ছবিটা উঠে গেল আমার চোখের ক্যামেরায়। মুখে কয়েকটা ব্রণের আস্তরণ। তাতেও সৌন্দর্যের কোনো ঘাটতি পড়েনি । ছাতার ভিতর থেকে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চোখে চোখ ফেললেন, যেন এক অপরিচিত মানুষকে প্রথম দেখছেন। আমি আর হাসতে বা কিছু বলতে সাহস না পেয়ে, কিছুটা গাম্ভীর্য বজায় রেখে এগিয়ে গেলাম। গাড়ি শান্টিং হচ্ছিল বলে আবার গাড়ি ব্যাক করে গেটের দিকে আসে। হঠাৎ ব্রেক ভ্যানে একটা কাগজের চিরকুট উড়ে এলো।বুঝতে অসুবিধা হলো না, লোকের সামনে না কুড়িয়ে , কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। গাড়িটা এক গাড়ি পিছিয়ে আবার ওর সামনে দিয়ে বের হয়ে গেলাম। তখন আরও একবার চোখে চোখ পড়লো।তারপর আমি সিটে বসে টাইমিং গুলো লিখতে থাকলাম। গেট খুলে যেতে দেখলাম, মেয়েটি ব্রেক ভ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।আমি চিরকুটটা তুলে নিয়ে পড়ে,মানিব্যাগে ঢুকিয়ে রাখি।"
সরমা চিরকুট এ কী লেখা ছিলো, সেটা জানার জন্য উৎসুক হলেও, মৈনাক ইশারা করে চুপ থাকতে বলে। রীয়াংশু কিছুক্ষণ চুপ থেকে, কটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, চা টা শেষ না করেই ওর ঘরে চলে গেল। মৈনাক পরের দিন লোটা কম্বল গুটিয়ে বৌকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। কারণ তার ব্যবসার সমস্যা হচ্ছিল। কাজের ছেলে আর বয়স্ক বাবা দুজনে মিলে সামলাতে পারছিল না।
তারপর বেশ অনেকগুলো বছর দেখতে দেখতে কেটে গেলো। মাঝে মাঝে মৈনাকের সাথে রীয়াংশুর ফোনে কথা হয়। তবে ফেসবুকের ছবিতে লাইক আর কমেন্ট চলতেই থাকে।রীয়াংশুর মুখটা ভারী হয়ে গিয়েছে এবং চুলেও বেশ পাক্ ধরেছে। কিন্তু আজও সে বিয়ে করেনি।এতদিনে মেল - এক্সপ্রেস ট্রেন ম্যানেজার হয়ে বাড়ির কাছাকাছি পোস্টিংও হয়ে গেছে।একদিন এক্সপ্রেস ট্রেনে চার্জ নিয়ে স্টার্টিং দেবে, এমন সময় একজন দূর থেকে ম্যানেজার সাহেব, ম্যানেজার সাহেব, বলে চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসছে। রীয়াংশু বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে পিছন ফিরে দেখে অবাক হয়ে গেল। চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়ে গেলেও ভদ্রমহিলাকে একমুহূর্তে দেখে, রীয়াংশুর চিনে নিতে অসুবিধা হয়নি। ভদ্রমহিলাও সামনাসামনি এসে চোখাচোখি হতেই কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। একজন ভদ্রলোক হাঁপাতে হাঁপাতে এসে, রীয়াংশুকে ধন্যবাদ জানিয়ে, একহাতে লাগেজ, অন্য হাত দিয়ে ভদ্রমহিলার হাত ধরে এগিয়ে গিয়ে শেষের কম্পার্টমেন্টে চেপে পড়ল দুজনে।এতো বছর পর প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, রীয়াংশু স্বপ্নেও ভাবেনি। রীয়াংশুর গাড়ি ছুটে চললো গন্তব্যস্থলের দিকে। রীয়াংশু মানিব্যাগ থেকে যত্নে রাখা চিরকুটটা বের করে, একবার পড়ে নিল। তারপর দরজা খুলে, হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে, একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিল।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

সোয়েটার
গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।

এখানে আসবে না কেউ
চেক - হ্যালো টেস্টিং - শুনতে পাচ্ছেন? শুনুন – জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে গেল। ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। দেওয়ালে ঘষটানির একটা শব্দ। পুরোনো বছর উড়ছে। আমি ৩১শে ডিসেম্বরে এসেই থমকে গেছি। বাইরে নতুন বছর চলছে, আমি পুরোনো বছরে। কীরকম অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয় ভাবে দেওয়াল ঘড়িটাও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।

অবনী বাড়ি আছো
“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?”