১৪ অক্টোবর, ২০২৬
ঢাল বেয়ে বেয়ে
ঢাল বেয়ে বেয়ে

সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক শহরের কুইন্স বরোর যে এলাকায় আমার বাসা, সেখানে এমনিতেই গাড়ির হর্ন, এম্বুলেনস, পুলিশ আর ফায়ার ডিপার্টমেন্টের সাইরেনে কোন নীরবতার অবকাশ নেই। যদিও অনেকদিন ধরে থাকতে থাকতে কিছুটা অভ্যস্ত হয়েছি কিন্তু তারপরও কাজে কর্মে মনোযোগ দেওয়া অনেকসময় বেশ কঠিন হয়ে যায়। আজকের অবস্থা এক কথায় ভয়াবহ। 

জুমকলে নিজেকে মিউট করে ছেলেকে চিৎকার দিয়ে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। বললো, যে বলগুলো নিয়ে সে খেলছে সেগুলো মাটিতে রাখলেই একা একা গড়িয়ে চলে যাচ্ছে। বকা দিলেও খেয়াল করলাম ওর কথা ঠিক। বলগুলো একই দিকে চলে যাচ্ছে গড়িয়ে। মেঝে কি ঢালু একদিকে? ওকে বললাম অন্য কিছু নিয়ে খেলতে। কেন যেন আমার নিজেরও মাথা ঘুরে উঠলো।

দুপুরের খাবারের জন্য একফাঁকে কিচেনে গেলাম রাইস কুকারে ভাত চড়াতে। তরকারি আর ডাল রান্না করাই আছে। ডিম ভাজব বলে ফ্রিজ থেকে বের করে কাউন্টারে রেখে কিচেন কেবিনেট থেকে পেয়াজ কাটার জন্য ছুরি বের করতে যাওয়া মাত্রই খেয়াল করলাম কিচেন কাউন্টারে ডিমটা গড়াতে শুরু করেছে। ধরে ফেলার আগেই মাটিতে পড়ে ফেটে গেলো সেটা। মেজাজ খারাপ করে লাথি মারলাম কিচেন কেবিনেটে। ব্যথা পেলাম বেশ। রাইস কুকার অন করতে গিয়ে অবশেষে খেয়াল করলাম কিচেনের কাউন্টার আসলেই একদিকে ঢালু। রাইসকুকারের ভিতরে পানির লেভেল দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। 

কুইন্সের এই এপার্টমেন্টগুলো বেশ পুরনো। বিল্ডিং কি হেলে পড়েছে? চিন্তিত হয়ে পড়লাম। দৌড়ে ছেলের কাছে গেলাম। এখনই বেরোতে হবে এখান থেকে ওকে নিয়ে। এপার্টমেন্টের বাইরে লোকজনের ছুটে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি। ছেলেকে জ্যাকেট পরিয়ে কোলে নিয়ে জ্বরের ওষুধ, ওয়ালেট, ফোন আর ঘরের চাবি নিয়ে ফায়ার এস্কেপ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এর মাঝেই নিচে লোক জড়ো হয়েছে বেশ দেখা গেলো। সবাই নিউজ দেখছে যার যার ফোনে। 

“নগর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো যাচ্ছে যে, নিউইয়র্ক শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মাধ্যাকর্ষণে সামান্য বিচ্যুতি লক্ষ্য করা গেছে। বেশ কিছু এলাকায় রাস্তা সহ ভবন সামান্য হেলে পড়েছে। এখনো তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন কাঠামোগতভাবে শহরের সকল ভবন সম্পূর্ণ নিরাপদ। নাগরিকদের অনুরোধ করা যাচ্ছে তারা যেন গুজবে কান দিয়ে আতংকিত না হন।” খবরে একটা মানচিত্র দেখাচ্ছে যেখানে কুইন্স আর ব্রুকলিনের কিছু কিছু জায়গা লাল রঙে চিহ্নিত। 

ইউটিউবে ঢুকলাম। কোন একজন ইনফ্লুয়েন্সার লাইভ স্ট্রিমে বলছে এটা নাকি সামরিক বাহিনীর গোপন কোন পরীক্ষার ফল। হয়তো কোন সিসমিক ওয়েপন। আরেকজন বলছে কিছুদিন আগে সরকারের একেবারে টপ লেভেলের যে কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে কিংবা দেশের অর্থনীতির যে বারোটা বেজে যাচ্ছে এসব দিক থেকে জনগণের নজর সরাতেই এতসব হচ্ছে। বিলিওনেয়াররা তো আছেই সরকারের পাশে। 

আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আমার নিচতলার এপার্টমেন্টের প্রতিবেশি ভ্যালেরিয়া। আমার দিকে ফোনের স্ক্রিনের ম্যাপ দেখিয়ে বললো, “দ্যাখো দ্যাখো, যেসব এলাকায় ইমিগ্র্যান্ট বেশি সেই এলাকাগুলোতেই এই ঘটনা।” ও কেমন যেন হেসে বলল কথাটা, যেন মজা করছে। কিন্তু চোখের দৃষ্টি থমথমে।  

দানিয়েলাকে দেখলাম ইশকুলে ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে কী অবস্থা সেখানে। এপার্টমেন্টের লোকজন কিছুটা আতঙ্কিত অবস্থায় বিল্ডিঙের দিকে তাকিয়ে আছে। এখনো দেখে সেভাবে বোঝা যাচ্ছে না ঠিক কতখানি হেলে পড়েছে ভবন। কাছেই মুহূর্মুহু শোনা যাচ্ছে এম্বুলেন্স আর দমকলের সাইরেন।

প্রায় পনেরো মিনিট পর সকলের ফোনে জরুরি নোটিফিকেশন এলো। “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণাধীন। সকল নাগরিককে অনুরোধ করা হচ্ছে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফিরে যেতে। কিছু কিছু এলাকার ভবন কিছুটা হেলে থাকলেও কোন ঝুঁকির সম্ভাবনা নেই। নগর কর্তৃপক্ষ অচিরেই এ বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণ করবে।” 

বারবার বলা হলো কোন ধরনের গুজবে কান না দিতে। অনেকেই ঘরে ফিরতে শুরু করলো। ছেলেকে নিয়ে আমিও ছুটলাম। ফেলে যাওয়া কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকায় একদিকে হেলে যাওয়া মেঝে বা কাজের টেবিল কিছুই যেন চোখে পড়ল না। তাছাড়া এখনো ড্রেসার বা কেবিনেটের উপরে রাখা জিনিসপত্র খসে পড়ার মত ঢালু হয়নি।

রাইসকুকার অন করে দিয়ে এসে কাজের টেবিলে বসে দেখি তখনো জুম কল চলছে। ইনফ্রা টিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য চেষ্টা করছে। কিছু কিছু ক্লায়েন্ট এর মাঝেই সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট নিয়ে ঝামেলা শুরু করে দিয়েছে এরই মাঝে। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে ভিডিও কল মানূষগুলোকে দেখি। পৃথিবী কাত হয়ে সব কিছু পড়ে গেলে যাক, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাজ করে যেতে হবে। 

প্রোডাকশনের ঝামেলা মিটতে বিকেল হলো। কাজ ছেড়ে উঠে দেখি ঘর আরও ঢালু হয়ে গেছে। জানালার ব্লাইন্ড সরিয়ে দেখি সূর্য ডোবার সময় হয়ে এসেছে। জানালার বাঁকা ফ্রেমে সূর্যাস্তের দৃশ্য। টিভিতে লাইভ নিউজ ছেড়ে দিলাম। যা হয় আর কি বড় শহরে সবসময়। কোন ধরনের বিপর্যয়ের আভাস এলেই আইন শৃংখলার অবনতি ঘটে। লিভিং রুমের জানালা দিয়ে রাস্তার ওপাশের কয়েকটা দোকানপাটে মানুষের জটোলা আর দৌড়াদৌড়িও চোখে পড়ল। 

দুপুরে খাওয়ার পর ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছিলাম ছেলেকে। দেখলাম ঘুম থেকে উঠে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ও। মোজা পরে ঢালু কাঠের মেঝেতে দৌড়ে এসে স্লিপ কেটে বসে পড়ছে। শৈশব জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মাঝেও আনন্দ খুঁজে পেলে তা উপভোগ করতে বাধা নেই। সে রাতে ঘুম এলো না। ছেলেটার পাশে গিয়ে শুলাম। এমনভাবে জড়িয়ে ধরে রইলাম যেন ছাদ ভেঙে পড়লে আমার গায়ে আগে আঘাত করে। ভোর অব্দি নির্ঘুম শুয়ে রইলাম। মাঝে মাঝে ফোনে খবরাখবর দেখলাম। মেয়রের ইন্টারভিউ, স্টেট গভর্ণরের প্রেস কনফারেন্স, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির ভাষণ ইত্যাদি। এক পর্যায়ে বিছানা থেকে উঠে একটা ছোট ব্যাগও গুছিয়ে রাখলাম দু’জনের।

পরের কয়েক দিনে আমরা এই হেলে থাকা দুনিয়ায় আরেকটু অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। দেখলাম অনেক প্রতিবেশীই তল্পিতল্পা গুটিয়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। হয়ত কিছুদিনের জন্য। খানিকতা ঝুঁকে সাবধানে হাঁটাচলা করার অভ্যেস হয়ে গেলো। বাচ্চারা ইশকুলে মেতে উঠলো অন্যরকম আনন্দে। টিফিনের বিরতিতে মাঠে খেলতে গিয়ে ইচ্ছামত গড়াগড়ি খেতে লাগলো। দেখা যেত সারি বেধে মাটিতে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে আর খিল খিল করে হাসছে। কিংবা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে গিয়ে মাঠে ঢাল বেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তাল হারিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। 

দালানের কোথাও ফাটল ধরেনি বলে আস্তে আস্তে নিরাপত্তার অনুভূতিও চলে এলো। মাঝে মাঝে এটা ওটা ক্লজেট বা কেবিনেটের উপর থেকে গড়িয়ে পড়া ছাড়া বাসায় তেমন কোন সমস্যা হলো না। শুধু দেশি গ্রোসারি থেকে বাজার করে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে দুই তিন ব্লক রাস্তা ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছি। গ্রোসারি আর রেস্টুরেন্টগুলোর সামনে যে ভিড় করে বাংলাদেশিরা চা সিগারেট খেতে খেতে আড্ডা দিত আর আড়চোখে মেয়েদের বুকপাছা মাপত সেই আড্ডা বেশ হালকা হয়ে গেছে এই ক’দিনে। দাঁড়ানোর জন্য ফুটপাত আর ততটা আরামদায়ক নেই। তবে মোটের উপর নগর কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক অভয় দেওয়া ঘোষণার কারণে এলাকার মানুষ দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। 

সেদিন লন্ড্রোম্যাটে কাপড় ধুতে গিয়ে ভ্যালেরিয়ার সাথে দেখা হলো। ও অনেকটা আমার মনে কথাই বললো, “এই এলাকার লোকজন সব সারা দুনিয়ার নানান জায়গা থেকে আসা। এসব ছোটোখাট সমস্যায় ফেলে এদের কাবু করা যাবে না।” আমিও সায় দিলাম, “ভালোই হয়েছে। এই ঢালের ঝামেলার কারণেই বরং ইমিগ্রেশন পুলিশের আচমকা হানা দেওয়া কমে গেছে।” 

নিজের কথা যদি বলি তাহলে বলব আমরাও মা-ছেলেতে ভালোই আছি। কিছুদিন আগে অফিসের কাজে একটা মিটিং-এ জয়েন করতে ম্যানহাটান যেতে হয়েছিল। মিডটাউন ম্যানহাটানের অভিজাত সমতল রাস্তায় সোজা হয়ে হাঁটতে গিয়ে বেশ মাথা ঘুরে উঠছিল। অনেকটা ভার্টিগো’র মত। মনে হচ্ছিল ঢালই তো ভালো।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

সোয়েটার
অবিন সেন

সোয়েটার

গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।

গল্প৭ মে, ২০২৪
এখানে আসবে না কেউ
রঙ্গন রায়

এখানে আসবে না কেউ

চেক - হ্যালো টেস্টিং - শুনতে পাচ্ছেন? শুনুন – জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে গেল। ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। দেওয়ালে ঘষটানির একটা শব্দ। পুরোনো বছর উড়ছে। আমি ৩১শে ডিসেম্বরে এসেই থমকে গেছি। বাইরে নতুন বছর চলছে, আমি পুরোনো বছরে। কীরকম অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয় ভাবে দেওয়াল ঘড়িটাও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।

গল্প৭ মে, ২০২৪
অবনী বাড়ি আছো
পার্থসারথী লাহিড়ী

অবনী বাড়ি আছো

“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?”

গল্প৭ মে, ২০২৪