
নাচোল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে উত্তর দিকের হাঁটা পথ ধরলেই পিঁপড়াডাঙার রাস্তাটা পাওয়া যাবে৷ সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলে পড়বে অত্র এলাকার সবচেয়ে পুরাতন গোরস্তান। যারা শর্টকার্ট রাস্তার ভুখা তারা দুপ্পহার কী—তেপ্পহার কী গোরস্তানের পাখি ডাকা নিঝুম রাতেও এই রাস্তা ব্যবহার করে। 'আসসালামু ইয়া আহলাল কুবুরে' পথচারীদের সালাম কবরবাসীরা পেয়ে থাকে বলে গোরস্তানের ভূতেরা যাত্রীদের নাকি তেমন ভয় ডর দেখায়না। এসব গোরস্তানের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করা পথিকদের অভূতুড়ে কথা।
পিঁপড়াডাঙার ইদন গুঙ্গি নাচোল স্টেশনে ডিম বিক্রি করতে গোরস্তানের রাস্তাটা দিয়ে প্রায় যাওয়া আসা করে। কিন্তু সে যে গুঙ্গি কথা বলতে পারে না তাই কেউ তার কাছে সেসব ভূত দেখা না দেখার প্রশ্ন করে না। আপনারা কি ইদন গুঙ্গির নাম শুনেছেন? নিশ্চয়ই অবাক হয়ে জিগ্যেস করবেন, কে এই ইদন গুঙ্গি ? সাথে এ-ও বলবেন— তার নাম আমরা কেউই শুনিনি। আর শোনবার কথাও না৷
পিঁপড়াডাঙা গ্রাম। ইদন গুঙ্গির বাড়ি। বয়স ষাট। বোবা—কালা। কানে শোনে না কিন্তু চোখ দিয়ে শোনে। এবছর সে তার মাজাভাঙা বাড়িতে হাত দিয়েছে। লোকে বলে ইদনের টাকা আছে খুব কিন্তু যে কিপটার কিপটা খরচ করেনা। আর খরচই বা করবে কেন? তার ভবিষ্যৎ আছে না! ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে ইদন তার টাকা গচ্ছিত রেখেছে৷ কিন্তু গচ্ছিত রেখেছে কোথায় সে খবর কাকের মুখে, চিলের মুখে উড়ে বেওয়ারিশ! ইদনের ঘরটা চারভাইয়ের ভাগ হয়ে যাওয়া জমির শেষ আইলে। তার ভাগে পড়েছে কটা ক্যাড়া ক্যাড়া আমগাছ আর দুটো নিমের গাছ। ইদনের অভিযোগ তার ভাই ভাতিজাদের নজর ঐ হৃষ্টপুষ্ট নিমগাছ দুটোর দিকে। যা ইদনকে জ্যৈষ্ঠ মাসে রোদের ঝালাস থেকে রক্ষা করে। ইদনের দাবি তার এক ভাতিজা বিদেশ থেকে এসে ফ্ল্যাট বাড়ি করবে তখন তার নিম গাছ কেটে চৌকাঠ কপাট করবে। এই খবর ইদনের ভেতর কে ঢুকিয়েছে জানে না কেউ। তবে ইদন জানে তার ভাতিজারা যে জারুয়ার জারুয়া একদিন না একদিন ঠিকই দখল করে নিবে। এগুলো শুনে ইদন বার বার পড়ে, 'ইন্নালাহা মা আস সবেরিন।'
পিঁপড়াডাঙার পশ্চিমদিকের খাঁড়ির পাশ দিয়ে নেমে গেছে সাহাপুরের রাস্তা। মানুষ হাঁটার রাস্তা হলেও রাতে জন্তু জানোয়ার হাঁটাচলা করে। গ্রামের মানুষ বলে ওটা এক অদৃশ্য সাপের পথ৷ অভিশাপের রাস্তা! মানুষ অদ্ভুত গল্পে নিজেদের অস্বিত্ব নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে চায়৷
অদৃশ্য সাপটি যখন ঐ পথ দিয়ে যায় আর সেপথে যদি মানুষ হাঁটে তাহলে সে কামড়াবেই। দূরত্ব যতই থাকুক। বিষ লাগবেই!
এই গ্রামে যত মানুষ সাপের কামড় খেয়েছে সবাই ঐ অভিশাপের রাস্তায়৷ সাপে কাটা অনেকের মধ্যে বেশ কয়েকজন মানুষ মারা গেছে। যারা কেউই প্রথমে বুঝতে পারেনি৷ মরার আগ মুহুর্তে একটা চিনচিনে ভাব তারপর ভয় জেঁকে বসলে বলে, 'আরে হামাকে সাপে কামড়ালছে নাকি জি!'
কেউ চেঁচায়, 'কবিরাজকে একটা কল দে বে!'
আর কেউ বলে, 'ভ্যান ডাক হাসপাতালে লিয়া যাইতে হইবে!'
বেশিরভাগ লোক প্রথমে কবিরাজকে প্রাধান্য দিয়ে হাসপাতালকে তাচ্ছিল্য করে। হাসপাতালও সুযোগে মানুষকে কঠিন তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু সবাই গিয়ে কবিরাজের বাড়িতে না মরে মরতে যায় হাসপাতালে৷
ডাক্তার রোগীর অবস্থা দেখে বলে, 'আপনারা আজরাইল সাথে করে রোগীকে নিয়ে এসেছেন কেন? প্রথমে নিয়ে আসতে পারেননি। এন্টিভেনম দিয়ে এখন কী লাভ?' যদিও তাদের কাছে এন্টিভেনম থাকে না৷ রাজশাহী রেফার করে দেয়। ডাক্তার আর মানুষের কথোপকথনের ফাঁকে রোগীর জান কবজ করে আজরাইল বুক ফুলিয়ে হাসপাতালের দালালের রুপ ধরে বেরিয়ে যায়৷ যাওয়ার সময় হয়তো বলে, 'তোরা আর মানুষ হইলি না বে, চোদনাই থাইক্যা গেলি!'
তারপর হাসপাতালে পড়ে কান্নার রোল৷ রেইন্ট্রি কড়াই গাছ জুড়ে বসে থাকা কাক ডেকে ওঠে। কিন্তু মানুষেরা শোনে, 'সা-প-প, সা-প-প, সা-প-প'
অভিশপ্ত রাস্তায় ইদনের মা মুরগিটা দশটা ছা রেখে গায়েব হয়ে গেল৷ সারাদিন এমনকি রাত অব্দি পেলনা তার মুরগির হদিশ। এরপর নিজেই ছাগুলোর মা হয়ে গেল। ইদন এটা সহজে মেনে নিতে পারল না৷ মনে মনে ভাবল এই তার শুরু একে একে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে৷ আজ মুরগি, কাল গরু, পরশু গাছ, তরশু তিনবিঘা ধানী জমি, চরশু এই ভিটা— তারপর নিজের জীবন। ইদন তার অধঃপতনের কাল্পনিক মানচিত্র বানিয়ে তাতে হাত চালাতে লাগল। সে এর বিহিত করতে এবং নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই কেসসা বয়ান করতে থাকল।
—হামার অত বড় মুরগিট্যা!
সাহাপুরের বউদের বাড়িতে তার মুরগির কেসসা একেবারে নিজেদের মুরগি হারানোর ব্যথায় পরিনত হল।
ইদনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বউগুলো সোনাইচন্ডিহাটের গল্পটা বলা শুরু করল। কীভাবে একদিনে তিন সন্তান হারায়—একজন দুখিনী মা। বউগুলো বলে, 'এক দুখিনী তোমার মতোন এত কান্দা কান্দেনি আর তুমি একটা মুরগি হারিয়্যাই এতগালা কান্দ্যা ব্যাড়ায়ছ!'
'সোনাইচন্ডিরহাটে কুন ঘটনা ঘইট্যাছিল জি ভানি?' ইদনের হাতের ইশারার মানে এই কথাগুলো দাঁড়ায়।
এক অভাগীর গল্প—
গরম কাল। ভ্যানে করে আইস্ক্রিমওলা এসেছে। মাইকে তার পুরাতন দিনের গান বাজছে৷ কারো কারো মাইকে ওয়াজ বাজে৷ সোনাইচন্ডিহাটের বেশিরভাগ ছেলে মেয়েরা টাকার বদলে গোবরের নুন্দা, ধান, চাল অথবা মুরগির ডিম দিয়ে এসব আইস্ক্রিম কিনে৷
অভাগী আইস্ক্রিমওলার মাইকের গান শুনতে শুনতে কোলে দু বছরের শিশুকে নিয়ে চলে যায় পোখরে। অথৈ পানি। কালো কুসকুসা। চাষের তেলাপিয়ার ঝাঁক গোল বৃত্ত করে মাছ গোত্রীয় খেলা খেলছে। অভাগী সেদিকে এক খোবলা পানি ছিটিয়ে ঘাটে বসে পড়ে। অভাগী কাঠের পিড়িতে কাপড়ের দলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি মারে৷ এদিকে অভাগীর দুই ছেলে বড়টার বয়স দশ আর তার পিঠেরটার বয়স আট বছর।
দুইভাই খেলা রেখে মাইকের গলা শুনে ভ্যানের কাছে যায়। সবাই যে যার মতো সোনাইচন্ডিরহাটে আইস্ক্রিম কিনে খাচ্ছে৷ ছেলে দুটির ভেতরে আইস্ক্রিম খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠলে তারা দুই ভাইয়ের একজন প্রথমে ছুটে যায় তাদের বাড়িতে; এবং গিয়েই মুরগির খুল্লাতে হাত ভরে ডিম বের করতে। হাত ভরতেই বড় ছেলেটি 'মাগগে' বলে ডেকে ওঠে। হাতে কিসে যেন চিমটি কাটলো। ছেলেটা ডিমটা নিয়েই দৌড় দিল, মাইক যেখানে গলা ছেড়ে গান গাইছে৷ বড় ভাইয়ের হাতে ডিম দেখে পিঠের ভাইটিও দৌড়ে গেল বাড়ি। সেও মাটিতে হাঁটু ঠেকিয়ে হাত ভরল খুল্লায়। যেমনি সে হাত ভরল ওমনি বড় ভাইয়ের মতো হল দশা, একই চিমটি একই ঝিনঝিনি একই শব্দ, 'মাগগে!'
এর পরের ঘটনাটি সোনাইচন্ডিরহাটে হইচই ফেলে দিল।
'এই বরেফআলার বরেফে বিষ আছে, দ্যাখো ছোড়াটা কেমুন করছে।' আইস্ক্রিম কিনতে এসে একজন বলল। এই ঘটনা দেখে জড়ো হওয়া মানুষ সবাই মারমুখো হয়ে ফুঁসছে। তারপর আইস্ক্রিমওলাকে ভ্যানসহ ঘিরে ধরল।
লোকটা হাতজোড় করে, মাইক বন্ধ করে অবাক হয়ে অভাগীর ছেলেটার ছটপট করা দেহের দিকে তাকিয়ে থাকল। এর মধ্যেই আরেকটা ঘটনা, অভাগীর দ্বিতীয় সন্তানটি ভাইয়ের পাশেই ছটপট করতে শুরু করে। মুখে শাদা ফ্যাফড়া উঠছে। আর বলছে, 'জ্বইল্যা গ্যালো জি! জ্বইল্যা গ্যালো জি!' এবার সোনাইচন্ডির হাটের সব মানুষ লাদনা লাঠি নিয়ে আইস্ক্রিমওলাকে মারার জন্য প্রস্তুত। এই প্রস্তুতির মধ্যেই অভাগীর ছেলেদুটি ততক্ষণে সটান হয়ে মাটিতে। তখন কারো হুশ হয় না যে ছেলেদুটিকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। আগেই বলেছি— যদিও হাসপাতালে এন্টিভেনম নাই! এর মধ্যে তাদের 'জ্বইল্যা গ্যালো জি,' শব্দটা বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই এবার আইসক্রিমওলাকে ছেড়ে গোল হয়ে বোল্লার চাকের মতো ছেলেদুটিকে ঘিরে ধরল। হট্টগোলের ভেতর পাঁচ থেকে দশ মিনিটের ব্যবধানে তাদের দম বেরিয়ে গেল।
সোনাইচন্ডিরহাটের লোকজনেরা খুবই ভীত হয়ে পেছনে সরে দাঁড়াল। হায় খোদা! বলে একজন লোক ছেলেদুটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এক্ষুনি অরঘে বাড়ি চল। সভাই হাতে লাঠি লিও।'
ছেলেদুটিকে মাটিতে শুইয়ে রেখেই সবাই হো হো করে যেদিকে অভাগীর বাড়ি সেদিকে ছুটল। হাতে ডিম নিয়ে গেছিল দেখে, মুরগির খুল্লা ঘেরাও করল। সোনাইচন্ডিহাটের মানুষেরা গোল হয়ে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এখানেই হারামি হত্যাকারীট্যা আছে।' একজন খুল্লার মুখে লাঠি ভরে চারপাশ খোঁচাতে লাগল। আর আট দশজন মতো লাদনা লাঠি উঁচিয়ে ধরে থাকল। এরমধ্যে দুর্নীতিবাজ— ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা হারানো নেতার মতো রেগে ফোঁস শব্দ সবাইকে কাঁপিয়ে তুলল।
একজন বলল, 'যায়নি রে যায়নি— আছে।'
খোঁচানি বাড়ল। এরমধ্যে দুজন দুদিক থেকে লাঠি ঢুকিয়ে দিল খুল্লায়। হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে ছিটকে বেড়িয়ে মেরুদণ্ড শক্তিশালী করে দাঁড়াল সে। 'এই আমি উপস্থিত হয়েছি। তোমরা সরে যাও!'
সবাই সরে দাঁড়াল। তারপর একে একে সবাই বলতে লাগল, 'এ যে গহামা! এ যে খড়িশ! ওগগে মাগে কত্ত পাইক্যা আছে বে!'
সে মেরুদণ্ড নামিয়ে পালানোর আগেই হত্যাকারী সাপটির মাথায় একজন লাদনার এক ঘা দিল বসিয়ে৷ সাপটির মেরুদণ্ড জলতরঙ্গের মতো কাঁপতে কাঁপতে নিশানাহীন ভাবে ছোবল মারতে লাগল। সাপটি বুঝতে পারল না সোনাইচন্ডিহাটের সমস্ত মানুষ এখন তার শত্রু৷ এবং সাপটি আন্দাজই করতে পারলনা সামান্য মুরগির কটা ডিম আহার করতে এসে জলজ্যান্ত দুটি মানুষ অদৃশ্য আহার করে বসে আছে।
উপস্থিত লোকজন সাপটাকে নিয়ে মেতে উঠল। এদিকে এই খবর অভাগীর কাছে পৌঁছে যেতেই কাপড়ের ডালি ফেলে সে দৌড়ে এল বাড়িতে। বাড়িতে এসে দুই সন্তানের লাশ দেখার আগে মৃত সাপের লাশটিকে ঘিরে বসে আছে লোকজন। অভাগী আসতেই সোনাইচন্ডিহাটের নারী পুরুষ তাকে সান্ত্বনার উদ্দ্যশ্যে ধন্বন্তরির মতো এগিয়ে গেল। কিন্তু কোন কাজই হল না। সে অবাক হয়ে দেখছে। বুকে পাথর চেপে বসেছে। কান্না নাই। তাই কেউ যে কান্না থামাতে জড়িয়ে ধরবে সেই পথটুকুও অভাগী বন্ধ করে দিয়েছে।
এরপর তাকে ধরাধরি করে ছেলেদের লাশের কাছে নিয়ে গেল। ছেলেদুটির দিকে কেউই তাকাতে পারছে না। আহারে কত কষ্ট করেই না ছেলেদুটিকে বড় করছিল অভাগী। সব শেষ। চোখের পলকে অভাগীর ভিটে খালি।
এসব শোকের মধ্যে হঠাৎ অভাগীর কি মনে হতেই দিল ছুট। 'কি হয়্যাছে রে অভাগীর কি হইল।' অভাগীর পেছনে যারা ছুটে গেছিল তারা গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
আল্লাহ এটা কি করল?
অভাগীর কোলের শিশুটি পুকুরের পানিতে বালিশের মতো ভাসছে৷ পুত্রদের মৃত্যুর খবর শুনে আত্তং-এ ঘাট থেকে ছুটে এসেছিল। কিন্তু সে ভুলেই গেছিল যে তার কোলের ছেলেটি পুকুরের পাটালে খেলছিল।
এই মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের কয়েক গ্রাম নিয়ে। সবাই সোনাইচন্ডিহাটের দিকে হাঁটা ধরল। সবার উদ্দেশ্য একই। এই মৃত্যু শোকে শেষপর্যন্ত অভাগীর কী হয়েছিল— ও কি জীবিত ছিল?
২.
গল্পটা ইদন গুঙ্গির পোষায়নি কারণ সাহাপুরের বউরা তার থেকে সোনাইচন্ডিহাটের মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। লাভ নাই, সে ফোঁসফাঁস করতে করতে ডান হাতের চার আঙুল মাটিতে দেবে উঠে দাঁড়ালো। তারপর পিঁপড়াডাঙার দিকে পা বাড়াল। সাহাপুরে এসে নিজের কাহিনি বলতে গিয়ে নিজে পড়েছিল ফাঁপরে৷ ইদন ইশারায় বলল, 'নিজের হারাইলে বুঝতিক রে মাগির্যা।'
দুখের কাহিনি বলতে গিয়ে সকালে আর আখা ধরাতে হল না তাকে। ইদন সাহাপুরে ঠিক খাওয়ার অক্তে পৌঁছে যায়। সাহাপুরের কয়েক ঘর তাকে অন্য চোখে দেখে। তারা তার মনের সকল ছল বুঝতে পারে। ইদন নিজে ঘরের ডিম কিংবা জমির শাক সবজি বিক্রির বেলায় এক টাকা এদিক ওদিক হলেও লেগে যায় ঝগড়া। তাকে সবাই চেনে কিন্তু গুঙ্গি বলে তার উপর পাঁচবার বিরক্ত হলে একবার সহায় হয়।
বাড়ি যাওয়ার পথে সাদেক মুন্সির সাথে দেখা৷ মাথায় ঘাসের বোঝা থাকায় তাকে ভূতের মতো লাগছিল।
হাত দিয়ে ইশারা করল, 'কুন্ঠে গেছিলা জি ইদন বুবু?'
ইদন কোন উত্তর দিল না। শুধু পা দিয়ে মাটির কাদায় একটা গর্ত করে থুথু ফেলে হাঁটতে লাগল।
সাদেক মুন্সি ইদনকে ডেকে বলল, 'ও ইদন বুবু শুইন্যা যাও ওরকম কর্যা চল্যা যাইছ কেনে? তোমার ইঞ্জিনিয়ার ভাই বেলে আইলো?'
'কুন্ঠে শুনল্যা তুমি?' হাত উঁচিয়ে ইদন জিগ্যেস করল।
'কেনে জি মাইক্রোতে আইলো বেলে। ঘাটার মানুষই তো কহাবুলা করছে৷ তা তুমি টো টো কর্যা কুন্ঠে হাট্যা বেড়াইছ? ভাই আইসসে ভালো মন্দ রান্ধোগা!'
ইদন সাদেক মুন্সির ইশারা বুঝে মুখ বেঁকালো। হাত উঁচিয়ে ইশারা করে বলল, 'ভাইয়ের আসার মুখে মুতি।'
সাদেক মুন্সি ইদনকে খেপিয়ে হাঁটা দিল। আর ইদন কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে মনে করল প্রাচীন সেই কথাগুলো, যেগুলোর আর কোন মূল্য নাই। ইদন আজও ভুলেনি সেই কথা। কত বছর হবে? এখন তো আগের মতো শরীরের ধমক নাই। মনের ভেতর রাগ পুষে পুষে বুকটা শিল পাথরের মতো হয়ে গেছে। সে বলে, 'ঐ ভাই হামাকে সংসার করতে দিলে না, আর উুঁ দিব্যি বহু বেটি লিয়্যা সংসার করছে৷'
ইদনের বয়স তখন কুড়ি বাইশ সবাই একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ইদন স্বাভাবিক মানুষ নয়। কথা বলতে পারে না আর পারবেও না কোনদিন এবং স্বাভাবিক মানুষের মতো ওর জ্ঞান বুদ্ধির বিকাশ হবে না। বড় ভাই ঢাকায় তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সরকারি চাকরিতে ঢুকে গেছে। ইদনের বাপ মরে যাওয়ায় ভাই বোনেরা সবাই অংশীদার হয়ে যায়৷ ইদন নিজের গরু পোষা থেকে ভাগের তিনবিঘা জমির ধান পেয়ে একদিন ইশারার মাধ্যমে বলে বসল, 'হামার বিহ্যা দাও। হামি বিহ্যা করব!'
তার এই কথা গ্রামে থাকার পর ঢাকায় ভাইয়ের কাছে চলে যায়। ইদন গরুকে পতিত জমিতে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যেত। আবাদের কাজে আসা কৃষকদের ইশারায় ডাকত!
'আয়! আয়! হামাকে বিহ্যা করবি?' তিনটা আঙুল দিয়ে মাটির দিকে ইশারা করত। এর মানে আমাকে বিয়ে করলে তিনবিঘা জমি পাবি। গরুটা পাবি। ডিহিমাটি পাবি।
ইদনের এতসব সম্পত্তির লোভে অনেক গরীব কৃষক তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল৷ আসলে ইদন চেয়েছিল ঘর করতে, স্বামী ও সন্তান নিয়ে জগতের অন্যান্য নারীদের মতো নিজের কিছু অবলম্বন করে বাঁচতে। একটা বিয়ের লাল কাপড়, একগাছা চুড়ি, সুগন্ধী সাবান, মুখে মাখা পাউডার ; পায়ে দেয়ার লাল রং, রঙিন কাগজ দিয়ে ঠোঁট রাঙানো, মশলা বাটা পাটায় — মেহেন্দি বেটে হাত রাঙানো। এসব শখ আহ্লাদ তাকে টপকে পিঁপড়াডাঙার অন্য মেয়েদের সাথ দিয়ে তাদের জীবনকে রঙিন করে তুলেছে। গ্রামে যখনই কারো বিয়ে বসে ইদনের মুখের দিকে তাকানো যেত না। কী একটা জীবন— ইদন জীবিত কিন্তু তার জীবনে চরম বঞ্চিতের স্বীকার সে। এমন ধনুকের মতো বাঁকা জীবন ইদন চায়নি।
গ্রামের মানুষজন বলত,' ইদন সংসার করে খেতে পারতো— উুঁ তো গু খাওয়া খেপি লয়! নিজের ভালো দিব্যি বোঝে।'
নিজের বিয়ের জন্য যখন সবকিছু সম্পত্তি দেওয়ার কথা শুনে তার ইঞ্জিনিয়ার ভাই ক্ষেপে উঠলেন— তিনি বললেন, 'আমি এসে দেখছি ওর কত বিয়ের কুড়কুড়ানি উঠেছে !' শত্রু নয় নিজের মায়ের পেটের ভাই এসব বলেছে।
পিঁপড়াডাঙা গ্রামে এসে ইদনকে সম্মুখীন হতে হল ভয়াবহ জেরার, 'কিসের বিয়ের শখ! পাগলি মানুষ বাপের ঘরে অন্য তিন ভাইয়ের মাঝে আছিস থাক! তোর কীত্তন আর ভালো লাগে না!আর কে তোকে বিয়ে করতে আসছে তাই দেখছি।' মোশাররফ থানায় জিডি করার হুমকি পর্যন্ত দিল। কেসের ভয়ে গ্রামের সরল কৃষকরা আর বিয়ের জন্য আগ্রহ দেখায়নি। ইদন পরে জানতে পারল যদি ইদনের বিয়ে হয় তাহলে তিনবিঘা জমি ও ডিহিসহ সকল সম্পত্তি বাইরে চলে যাবে৷ আর যদি ওর বিয়ে আটকানো যায় তাহলে ইদন মরলে সব সম্পত্তি ওদের হয়ে গেল। অসহায় হয়ে আবু জেহেলের মতো ভাইকে ইদনের তখন থেকে ঘৃণা। মোশাররফের আসার কথা শুনে সেই আগের কথা মনে পড়ে গেল তার।
হঠাৎ দুপুরের রোদ বাতাসে তার মুখ গরমে গেল, নিজের কত বয়স হল আর কী হারালো সাধের মুরগি ছাড়া ইদন তাই মনে করে কেঁদে উঠল! ইদন বরেন্দ্রর পোড়ামাটির সর্পিল খাঁড়িটার মতো আজও একা!
৩.
দুপুর বারোটার দিকে দুধ সাদা রঙের মাইক্রোটা এসে থামল। যে রাস্তাটা নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে— সেখান অব্দি এসে আর ভেতরে গেলনা মাইক্রোটা। মিনিট দশেক পর মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ার নামল। চোখে সানগ্লাস দেখে খুবই রুচিবাগীশ মনে হল। তিনি বললেন, 'তোমরা এখানেই নেমে পড় গাড়ি আর ভেতরে যাবে না।'
এ বছর মোশাররফ ও তার স্ত্রী হজে যাবে তাই দেখা করতে গ্রামে এসেছেন। মাইক্রো থেকে দুজন নামলেন। মোশাররফের স্ত্রী দিলরুবা ও বড় মেয়ে পুষ্পিতা। দুজনের মুখেই বিরক্তি। মরতে কেউ এসব জায়গায় আসে। দিলরুবা বেশি বিরক্ত। তিনি বললেন, 'ফোনেই বলে দিলে হত এখানে আসার কি কোন মানে হয়?'
ড্রাইভার তাদের পিছে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে, সে বলল, 'কোনদিকে যেতে হবে স্যার?'
মোশাররফ বললেন,'এসো আমার সাথে।' জোহরের আজান দিব দিব অবস্থায় ভন্নিদুপুরে তারা সেই অভিশপ্ত রাস্তাটা পেরিয়ে গলির মুখে উঠতেই দিলরুবার পা গেল মচকে! 'আশ্চর্য! শুকনো ভালো রাস্তায় এভাবে এক্সিডেন্ট হওয়ার কথা তো না।' মোশাররফ হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলেন তার কি যেন একটা কথা মনে পড়ে গেল, এতদিন যা তিনি ভুলেই গেছিলেন।
মোশাররফ তাকিয়ে দেখলেন, সেই তালগাছ তারপর খানিকটা নিচু হয়ে পিটালি তলার ফাঁক দিয়ে দেখলেন প্রাচীন বাঁশের থোপটা এখনো আছে। তবে তার আয়তন কমেছে। পুরাতন কথা মনে পড়ে গেল— অভিশপ্ত রাস্তা!
মোশাররফ ভয়ে দ্রুত স্ত্রীকে টেনে গলির রাস্তায় তুললেন।
মোশাররফের সাদা শার্টের উপর রোদ পড়লে রংটা কেমন ঘিয়ে দেখাচ্ছিল। হঠাৎ অসুস্থ হওয়া বউ এই গ্রামে এসে এত বিরক্ত হল যে পা না মচকালে সে আজই রাজশাহী ফিরে যেত।
পুষ্পিতা ইশারা করল, 'কোনটা বাড়ি?'
মোশাররফ গম্ভীর গলায় বললেন, 'ভুলে গেছিস!'
পুষ্পিতা হেসে বলল, 'কিভাবে চিনব সে কোন ছোট বয়সে দাদি মরার সময় এসেছিলাম, তখন মাঠ আর মাঠের মধ্যে মাটির একতলা দোতলা বাড়ি দেখেছিলাম। সবুজ ধানক্ষেত, ঝাঁক ঝাঁক তালগাছ ছিল এবং শুকনো একটা নদীও ছিল— কিন্তু এখন অনেক বাড়ি হয়েছে দেখছি তালগাছগুলো আর নেই।'
মোশাররফ মেয়ের কথা থামিয়ে বললেন, 'শুকনো নদী যেটাকে বলছিস ওটা আসলে খাঁড়ি। আমাদের বাড়ির পেছনের মাঠ দিয়েই বয়ে গেছে। এখনো আছে বোধহয়।
সময় হলে দেখাব।' এবার দিলরুবা চরম ক্ষেপা খেপলেন , 'অত ঘোরাঘুরি করতে হবে না যা করতে এসেছ তা করে দ্রুত ঢাকায় ফেরত যাব।' কী উত্তর দেবেন বুঝে উঠতে না পেরে মোশাররফ ভ্যান ভ্যান করা মাছির মতো দৃষ্টির পাখনা এদিক ওদিক ওড়াতে লাগলেন।
মাটির বাড়িটি আর নাই। পেছনে আবাদি জমি। দূরে খাঁড়ি আর খাঁড়ির দুইপাশে শিশুগাছ। মোশাররফ দেখলেন পুরাতন ভিটাই পাকা দালান। কলাম তুলে বাড়ি করেছে। কলাম তুলে বাড়ি না করলে বরেন্দ্রর পাকা মাটির চাপে দেয়াল ফেটে যাবে। বাড়ি টিকবেনা বেশিদিন।
মোশাররফের ভাতিজা বিদেশে গিয়ে টাকা করেছে। সেই বাড়িটা করছে । কাজ এখনো চলমান কিন্তু বড়লোক চাচা ও তার পরিবার আসবে শুনে কাজ আপাতত বন্ধ।দিলরুবাকে ধরে ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। পুষ্পিতা মায়ের দিকে তেমন নজর না দিয়ে বাইরে মোবাইলে নেটওয়ার্ক ধরার জন্য ঘুরঘুর করছে।
মোশাররফের ভাতিজা ইমন সে তার বউকে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ এই চাচি একদিন যে ব্যবহার করেছিল আজীবন মনে রাখার মতোই ব্যবহার। ইমন ও তার ছোট ভাই ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজে গিয়েছিল। পহেলা বৈশাখের জন্য কাজ বন্ধ ছিল দেখে ঠিকানা অনুযায়ী তারা মোশাররফের ঢাকার বাড়িতে যায়। কিন্তু দিলরুবা তাদের গরীব বলে ঢুকতে দেয়নি। নিচ থেকেই ফিরিয়ে দিয়েছিল। লুঙ্গি পরে গেছিল কিনা৷ সেদিন দুই ভাই অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিল। কিন্তু বাড়িতে সে কথা বলাতে গোটা পিঁপড়াডাঙা গ্রাম জেনে গুজব গাইতে থাকে৷ এই গুজব গান এত মধুর হয়ে ওঠে যে ইমন ও তার ভাই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরলে বোল্লার চাকের মতো ঘীরে ধরে জিগ্যেস করতে থাকে। 'বড়লোক ভাতার পায়্যা তোর চাচি মাগির চোখ উল্ট্যা গেছে বাদ্দিগর আর যাইসন্যা। দিল নাই ফের নাম আবার দিলরুবা! কেমন বেটিছ্যাল্যা গে, ছোড়া দুটা নিজের চাচার বাড়িতে গেছিল নাহিন— তার ল্যাগ্যা এরকুম করতে হইবে, ছি!'
এখন তাদের দিন ফিরেছে। ইঞ্জিনিয়ার চাচা আসবে শুনে বাড়ির রাজহাঁস জবাই করেছে, জমির আতপ চাল দিয়ে পোলাও পাক করা হবে৷ ঘরের দেশি মুরগির ডিমের দোপিয়াজা। সজনে শাক। বিয়ে বাড়ির মতো ডুমকা ডুমকা করে আলু ভাজি। কালাইয়ের ডাল। আর মতিন ঘোষের দই। সাথে এক লিটারের কোকের বোতল ও আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই আয়োজন, তাদের সামর্থ্যতে যা জুটেছে আরকি। খেজুরের পাতার পাটিতে বসতে পারবে কিনা জিগ্যেস করে দুপুরের খাবার আগানো হল। খাবারের আয়োজন দেখে মোশাররফ তো চেচিয়ে উঠল, 'সর্বনাশ এত আইটেম করেছিস,কোনটা রেখে কোনটা খাব? আমার তো ডায়াবেটিস, প্রেশার!' মোশাররফের উত্তেজনা দেখে দিলরুবা আড় চোখে তাকালো। দিলরুবা পায়ের জন্য বিছানায় খেতে বসল। যদিও ব্যথাটা এখন আর নাই। ইমনের বউ খুবই যত্ন করে খাবার তুলে দিচ্ছে।
মোশাররফ কয়েক লোকমা ভাত মুখে তুলে আরাম করে খেতে খেতে বলল, ' ইদন কইরে বলিসনি ওকে, দেখছিনা যে!' ইমন বলল, 'বেটিকে সকালে কহ্যাছিনু যে দুপপহারে হারঘে দিকে খাইও, কহিনি যে আপনারা এঠে আসবেন।'
—দ্যাখ তো ঘরে আছে কিনা!
ইমন বাইরে গিয়ে ইদনের বাড়ির দিকে হাঁক দিতে দিতে গেল, 'ও বেটি! ইদন বেটি জি ঘরে আছ?'
কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ইমন তার ঘরের দিকে দেখল তালা মারা। ইমন ফিরে এল।
মোশাররফকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই ইমন বলল,' ইদন বেটি ঘরে নাই তালা মারা, বোধহয় সাহাপুরের দিকে গেছে।'
৪.
বিকালে নিজের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে দেখা করতে বের হলেন মোশাররফ। গ্রামের কৃতি সন্তান সে। এমনকি দেশের ও। গ্রামে প্রচলিত আছে মোশাররফ মস্ত বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশের দশ জন ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে ও একজন। পুরাতন মানুষেরা তাকে দেখে ভীড় করল। শুনল হজে যাচ্ছে সে, তারপর মোশাররফ সবার হাত ধরে খোঁজ খবর নিয়ে মাফসাফ নিল। গ্রামের গেরস্থ বাড়ির ছেলে আজ কতবড় হয়েছে। এই নিয়ে অনেকক্ষণ ধুলা উড়াউড়ি আলোচনা চলল।
একমাত্র জীবিত চাচার বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন মোশাররফ। বাড়ির মুখের ডহারে দেখা পেয়ে গেলেন মকবুল আলির৷ তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। রিটায়ার্ড করার পর গ্রামে চলে এসে জমিজমা দেখা শুনা শুরু করেন৷ ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকার চেষ্টা করেন। ছেলেরা ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত। দুই ছেলের একজন একটা কোম্পানিতে ভালো পদে আছে আর ছোট ছেলেটা বিদেশ গেছে। মকবুল আলি ছেলেদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে যথেষ্ট খুশি, বর্তমান সময়ে দেশের চাকরির যে অবস্থা তাতে খোদা তাদের রিজিকের উত্তম ব্যবস্থা করে দেওয়ায় তিনি প্রায়ই বাড়িতে লোক খাওয়ান।
গ্রামে যাদের টাকা হয়েছে তারা বেশিরভাগই পাকা দালান তুলেছে কিন্তু মকবুল আলি সেই মাটির বাড়িতেই থাকছেন। ছেলেরা বলেছিল পেনশনের টাকায় অনেকে বাড়ি করে। মকবুল আলি রাশভারি গোছের মানুষ তিনি কোন উত্তর দেননি। তার কোন উত্তর না পেয়ে ছেলেরা আর সাহস করেনি বাড়তি কোন প্রশ্ন করার।
—আসসালামু আলাইকুম চাচা কেমন আছেন?
—সবই আল্লাহর দয়া। তুমি এসেছ শুনলাম তা এবার নাকি হজে যাচ্ছ ?
—জি চাচা।
—খুবই ভালো খবর। বউমা এসেছে?
—জি। সাথে বড় মেয়েও এসেছে।
—ছোট মেয়েকে আনোনি? আর জামাই?
—আসলে মান্নানের বিদেশ যাওয়ার কথা হচ্ছে তো স্কলারশিপের ব্যাপার নিয়ে মহা ব্যস্ত!
মকবুল আলি একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, 'তোমার বিহাইন আসে মাঝেমধ্যে, গরীব মানুষ। তার উপর বিধবা, তোমার জামাই কি মায়ের খোঁজ নেয়না? ছেলের সাথে কি যোগাযোগ নাই?'
—থাকবেনা কেন? মাসে মাসে টাকা বিকাশ করে দেয় তো।কথাটা খুব অহংকার নিয়ে বললেন মোশাররফ।
—টাকা পাঠালেই কী সব দায়িত্ব পালন করা হয়? তোমার জ্ঞান বুদ্ধি ভালো বলে সবকিছুই নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছ। মহিলাটা আর ক'দিনই বা বাঁচবে, মা ছেলেকে আলাদা করে তার হক মেরো না।
—কী যে বলেন চাচা, ছি ছি।
—শুনতে খারাপ লাগছে তোমার, আমার ও বলতে খারাপ লাগছে। ইদনের সাথে দেখা হয়েছে?
—ও নাকি আমার আসার কথা শুনে পালিয়েছে। ওর ঘরের যে অবস্থা দেখলাম ভাবছি ওকে পাকা দালান করে দিব। ভাই বলে একটা দায়িত্ব আছে তো।
—দায়িত্ব কিন্তু এখনকার চেয়ে তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল মোশাররফ। শিক্ষিত মানুষ হয়েও তুমি তোমার বোনের সাথে যা করেছ— সেকি তোমার তৈরি ঘর নেবে?
মোশাররফ এবার চুপ মেরে গেলেন।
—ও পালিয়ে গেছে মানে বুঝেছ? সবাই ভুলে গেলেও আজও ইদন সে কথা মনে রেখেছে। মকবুল আলি নিজের কথা থামিয়ে আবার বলল, ' চলো বাড়ির দিকে।'
মোশাররফ এতক্ষণ মুখ বুজে শুধু শুনে গেল, এত বড় বড় কথা বলার সাহস— আবার তার ভুল ধরা এমনটা মোশাররফের জীবনে ঘটেনি। খানিকটা ইতস্তত হয়েছে বটে কিন্তু মাইক্রোটা যে হঠাৎ সামনে চলে আসবে তা সে ভাবতেই পারেনি৷ মোশাররফ ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল মনে মনে তারপর মকবুল আলিকে বললেন, 'আপনার বউমা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছে তো তাই দ্রুত রাজশাহী ব্যাক করব। আজ আর যাব না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।'
নাচোল স্টেশন বাজার থেকে তেল ভরে বিকেলের ক্লান্ত ধুলো উড়িয়ে মাইক্রোটা তাদের সামনে এসে থামল — নিজেকে কন্ট্রোল করে শান্ত ইমেজটা রেখে সালাম দিয়ে মাইক্রোতে উঠে পড়লেন মোশাররফ!
৫.
তখন বিকেল আসরের নামাজ ভেঙে গেছে। আকাশ হলদেটে মাখনরঙা! রাখালগুলো গরুর দেখভালের মধ্যে চুটিয়ে গল্প মারছে সার সার দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের গোড়ায়। তাদের গলায় ও মাথায় গামছা প্যাঁচানো। এদের মধ্যে কেউ কেউ গামছার কানা চিবুচ্ছে। মোটরসাইকেলের চাকার ধুলা পশ্চিমদিকে লাড়া পোড়ানো ধোঁয়ার মতো কুন্ডলী পাকিয়েছে। পাখি ডাকছে। গরু গুলোর কোন ডাক নাই, ধানের পোকারা মাঝে মাঝে গতরে বসলে লেজ দিয়ে তাড়ানোয় যা বাড়তি কাজ। যখন রক্ত খেকো মাছিরা বসে তখন গো গো করে সামান্য ডেকে চার পা নাচিয়ে ছিটপিট করে। রাখালগুলোর মেজাজ ভালো থাকলে পাত্তা দিয়ে ভাঁটের ডাল ভেঙে মাছি মারে—আর যদি মেজাজ খাট্টা থাকে বা মালিকের সাথে ঝনজোট হয় তাহলে, যতই গরুগুলো ছিটপিট করুক তাতে আর পাত্তা দেয়না। গোঁয়ারের মতো মাটিতে দেবে বসে থাকে।
পিঁপড়াডাঙা যাওয়ার জন্য বাথানের কাছে লুতফন ভ্যান থেকে নামে। আসরের নামাজ পড়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। দ্রুত যাওয়ার জন্য লুতফন জোড়া তালগাছের ফাঁক দিয়ে যাচ্ছে৷ ভাড়াটাও কম লাগল।
মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ার সকালে কল দিয়েছিল, ' আমরা এবছর হজে যাচ্ছি এইজন্য আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে পিঁপড়াডাঙা আসছি, তুমিও এস।' ব্যস এটুকুই কথা৷
লুতফন আড়ি বেওয়া মানুষ। স্বামী অনেক আগে মারা গেছে। খুব কষ্টে নিজের আর ছেলেটার পেটের ভাত করে এতদূর এসেছে। ভেবেছিল শেষ জীবনে সুখ হবে৷ লুতফন তো সুখের আশা সেই স্বামী মরার পর থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু যখন তার ছেলে মান্নান বুয়েটে চান্স পেল তখন গ্রামের মানুষ তাদের বাড়ি ভীড় করে দেখতে এসে বলেছিল, 'লুতফন একদিন তোর খুব সুখ হইবে।'
সাংবাদিক এসেছিল বাড়িতে ছবি তুলল, অনলাইনে মান্নান ভাইরাল হয়ে গেল। সে জীবনে দুই বার ভাইরাল হয়েছিল প্রথমবার একসাথে বুয়েট, রুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে আর দ্বিতীয়বারেরটা পরে বলছি। একটু ধৈর্য ধরুন। লুতফন মান্নানকে বলেছিল, 'ব্যাটা রাজশাহীতেই ভর্তি হ, এখ্যানে কাছে, আর ঢাকা মেলা দূর অত খরচ কি বহিতে পারব ব্যাটা!' মান্নান মায়ের সরল মনের প্রশ্নকে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে উত্তর দিয়েছিল, 'মা বুয়েটে চান্স সবাই পায়না, হামি প্যায়াছি তুমি টেনশন করিও না, হামি টিউশনি করিয়ে নিজের খরচ চালাব।'
ছেলের কথা শুনে গ্রামের মানুষের বলে যাওয়া কথায় কিছুটা বিশ্বাস করল লুতফন কিন্তু বছর ঘুরতেই তার ও মান্নানের জীবন ভয়াবহ ভাবে ওলট পালট হয়ে যাবে সেটা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি৷
কী ঘটেছিল?
বুয়েটে ভর্তি হবার পর মান্নানের চমৎকার দিন কাটছিল। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি তরুণ যে প্রথম একা ঢাকায় থাকছে। পরিচিত বা আত্মীয় স্বজন কেউ নাই। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় দ্রুত বন্ধু সার্কেলও গড়ে ওঠে। এবং বন্ধুদের মারফত একটা টিউশনি ও জুটিয়ে নেয়।
মান্নানের জীবনে বিপুল অন্ধকার নিয়ে হাজির হয় তার হলরুমে আসা রাজনৈতিক গণ্ডারের হাপরগিরি!
হলে থাকতে হলে এসবে আসতেই হবে, নইলে অসংখ্য ছায়া হুমকি তার পেছনে ঘুরপাক খেতে থাকে৷ অনিচ্ছাকৃত মিছিলে হাঁটা, নতুন ছেলেদের তথাকথিত সেই গণ্ডারের দল ধর্মে ধর্মান্তরিত করা ছিল তার কাজ। কোন মানুষ কখনো একটা জন্তুর দল করতে পারে না— তাই বলে গণ্ডারের দল! মান্নান দেখল হল থেকে বেরিয়ে বাইরে মেসে থাকতে গেলে অনেক খরচ, আর এই খরচ টানার মতো টাকা তার মায়ের নাই। সেসব কথা বিবেচনা করে সে গণ্ডারদের কথা মতো বাধ্য প্রজা হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
একদিন শীতের ভোরে আবারও লুতফনের বাড়িতে সাংবাদিক আর গ্রামের মানুষে ভরে যায়৷ এবার কী?
'লুতফনের ব্যাটা মান্নান কত ভালো ছ্যাল্যা বুয়েটে কুন ছ্যালাকে নাকি ম্যার্যা ফেল্যাছে।' মান্নানের ছবি খুনিদের সাথে অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায়। এখন কী করবে লুতফন কাকে ধরবে? সে গ্রামের মেম্বারকে গিয়ে ধরে। মেম্বার লুতফনের অসহায়ত্ব দেখে পরামর্শ দেয় মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেখা করার। এলাকার ছেলে সে দেশের বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার । শোনা কথা বর্তমান সরকারের সাথে তার খাতির নাকি ভালো।
লুতফন মোশাররফের মোবাইল নম্বর পিঁপড়াডাঙা এসে জোগাড় করে—প্রথমে কথা বলে৷ ব্যস্ত মানুষ গ্রামের এক বিধবার কথায় কোন গুরুত্ব দিল না। অবশেষে মেম্বারের সাথে কথা হয় তার। পরবর্তীতে জানা গেল মোশাররফ, মেম্বারের বংশের কোন দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয়। সেই সুবাদে ভালো করে ঘটনাটি শুনল সে। প্রায় মিনিট বিশেক মতো কথা বলার পর মেম্বার লুতফনকে আশ্বস্ত করল, ব্যাপারটা মোশাররফ নিজের মনে করেই দেখবেন৷
গোটা দেশে বুয়েটের সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে হইচই পড়ে গেল। গ্রেফতার হয়েছে মান্নানসহ বাকি সব আসামিরা। নিউজ হয়েছে মূল আসামি পলাতক৷
ছেলের জন্য না খেয়ে কেঁদে কেঁদে অস্থির লুতফন। মানুষ প্রায় আসে তার বাড়ি। সে একটিবার ছেলেকে চোখের দেখা দেখতে চায়। কত কষ্ট করে মানুষ করেছে ছেলেকে৷ খেয়ে না খেয়ে কানের একজোড়া সোনার দুল বিক্রি করে প্রাইভেট কোচিং করিয়েছে। শুধুমাত্র দুটো ডাল ভাতের জন্য৷ এগুলোই লুতফনের কাছে চুড়ান্ত সুখ৷ ছেলেটাই যে তার শেষ অবলম্বন— ইহকালের সম্বল। পরকালে যেন ঠেকাতে না পড়ে সেজন্য নামাজ, রোজা বাদ দেয়না লুতফন। ছেলের জন্য সকাল সন্ধ্যা কোরান পড়ে দুয়া করে সে। কোরান পড়ার সময় চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে ভিজে যায় আরবি কালো হরফের জমিন৷
পরদিন আবার যখন সে কোরান পড়তে খোলে— দেখে লবনাক্ত পানিতে পাতাগুলো বৃদ্ধ মানুষের চামড়ার মতো জড়োসড়ো হয়ে গেছে। লুফতন হাত বুলিয়ে আবার পড়ে ৷ আঙুল কাঁপে৷ চোখ দিয়ে আবার টপটপ করে পানি পড়ে হরফগুলো থেঁতলানো তুঁতফলের রসের মতো দাগ ধরে থাকে।
এর মধ্যে অনেক জল গড়িয়ে যায়৷ দামুসের বিলে বানের পানি আসে আবার চড়চড়ে রোদে পানি ভুলুক দিয়ে নেমে যায়। মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ারের প্রভাবে প্রায় দশ মাস পর জেল খেটে বের হয় মান্নান। এখানে বলে রাখা ভালো— সেদিনের ছাত্র হত্যার মতো ঘৃণ্য অপকর্মের সাথে মান্নান জড়িত ছিল না। আর এটাই তার জেলমুক্তির জন্য প্লাস পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। মান্নান যেদিন মুক্তি পেল সেদিন মোশাররফ নিজে গিয়ে মান্নানকে বাড়িতে নিয়ে আসে। মান্নানের ছাড়া পাওয়ার কথাটা মোশাররফ চেপে গিয়ে তার দুদিন পর দুপুরে ফোন করেন লুতফনকে৷
ফোন ধরেই কান্নায় ভেঙে পড়ে লুতফন বলে, ' ভাইজি হার ব্যাটা!'
—হ্যাঁ অত টেনশন করিও না, তুমি আমাদের দ্যাশের মানুষ আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।
—অকে হামার কাছে আইন্যাদেন জি ভাই, হামার যা কিছু আছে ডিহি জমি সব বিক্রি কর্যা আপনাকে দিব খালি হার মান্নানকে আইন্যাদেন জি ভাই।
লুতফনের কান্না শুনে মোশাররফ বললেন, 'কান্দিও না খুব তাড়াতাড়ি দেখতে পাব্যা, তবে আমি তোমার কোন জমি বিক্রির টাকা লিব না আর যা খরচ হবে বা হচ্ছে তা তোমার ঐ ওসব বাড়ি বিক্রি টিক্রির টাকায় হবেও না।'
—তাহিলে।
খানিকক্ষণ দম মেরে মোশাররফ বললেন, 'তাহলে কথা হচ্ছে গিয়ে আমি যা করার করব, ছেলে তোমার বুয়েটেই পড়বে।ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছিল সেটা অবশ্যই আমার জন্যই ফেরত পাবে। কিন্তু হলে থেকে ওর পড়াশোনা আর নয়।'
—তাহিলে অকে নাচোলে পাঠিয়্যা দেন, এঠেই কলেজে ভর্তি কইর্যা দিব।
মোশাররফ চাপা স্বরে বললেন, ' তোমার মাথা খারাপ! ছেলে এত ট্যালেন্ট ওর বুয়েটে'ই ঠিক আছে। তবে একটা কথা বলার ছিল।'
—কী জি ভাই কহেন?
—তোমার ছেলের সাথে আমার ছোট মেয়ে উর্মির বিয়ে দিব। আমার বাড়ি থেকেই পড়বে, যতদিন না চাকরি পাচ্ছে সকল খরচ আমিই চালাব।
—ঘর জাওই?
—ওরকই বলতে পার।
লুতফন আরও কী বলতে যাবে তার আগেই মোশাররফ আবার বললেন,'আমার মেয়েও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে একটা বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে, আগেই বলে নেই ঊর্মির একটু সমস্যা আছে। এই ধরো স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে পারে না এবং কানেও শোনেনা, ডাক্তার দেখিয়েছি অনেক ডাক্তার বলেছে কানে ইয়ার মেশিন ব্যবহার করতে, তাহলে হালকা শুনতে পাবে। মেয়েটা খুবই জেদি ইউনিভার্সিটিতে তাকে প্রতিবন্ধী বলে ক্ষেপাবে বলে ঐ মেশিন ব্যবহার করবে না। তাকে বলেছি হিজাবের ভেতরে থাকবে কে দেখবে?'
লুতফন নিশ্চুপ সে কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে বলে, 'আপনার বেটি তাহিলে যে গুঙ্গি?' মোশাররফ একটু নরম হয়ে আবার নিজেকে কঠোর করে বললেন , 'দ্যাখো এই যুগে এসব কোন সমস্যাই না। আমার মেয়েকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবেনা ওর সমস্যা আছে। ও যথেষ্ট চালাক না হলে এমনি এমনি কী ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে সে! শোন আমি যা বলার বললাম তুমি ভেবে দ্যাখো বেশি সময় নাই কিন্তু!'
লুতফনকে এরকম একটা দোলাচালের উপর ছেড়ে দিয়ে মোশাররফ ফোন কেটে দিলেন। লুতফন ফোন রাখার পর বুঝতে পারল, দেশের অতবড় ইঞ্জিনিয়ার কেন তার মতো গরিবের জন্য এত খাটা খাটছে। লুতফন সারাদিন সারারাত শুধু ভাবে। ভেবে ভেবে নিজের মাথা গলির বাবলা গাছে মারে। তার সামনে মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ারের শর্তের কথাগুলো বালু দেয়া ধারালো হাঁসুয়ার মতো মনে হয়। সেখানে দুটি মাথা যাবে, লুতফন ও তার পুত্র মান্নানের।
শুক্রবার সকালে আবার ঢাকা থেকে সেই পরিচিত নম্বর উঠে কল আসে। এবার মোশাররফ নয়— মান্নান! মান্নানের কান্না জড়িত কণ্ঠ শুনে আনন্দে হতবিহ্বল হয়ে লুতফন ভেসে যায়৷ ছেলের সাথে কথা বলার পর লুতফন আর কোন কথা তুলেনি, পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে মোশাররফের কথায় রাজি সে হয়৷
এই ডিসেম্বরেই বিয়ে।
জীবন কখন যে বাঁক নেয় তা বলা যায় না৷ বদলের হাওয়া আসে৷ হাওয়া তো নয় ঝড়। মান্নান আস্তে আস্তে লুতফনের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিল। সে জিগ্যেস করলে মান্নান বলে,'পড়াশোনায় খুব ব্যস্ত থাকি প্রতিদিন কথা বলার জন্য সময় বের করা কঠিন।'
লুতফন খেয়াল করে তার সাথে কথা বলার ভাষাও বদলে গেছে— তার মুখে এখন শহুরে ভাষা। আর ছেলে যে উলটে গেছে সেটা মান্নান মুখে স্বীকার না করলেও লুতফন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। মা তো! যে ছেলে কথা বলতে গিয়ে ব্যস্ততার বাহানা দেয় তাকে কীভাবে বাড়ি আসার কথা বলা যায়। তবুও লুতফন বলে, 'বাড়ির দিকে কখন আসবি?'
মান্নান ফট করে বলে,' উর্মি গিয়ে কী থাকতে পারবে? এসিতে থেকে অভ্যাস, তাছাড়া বাথরুমের প্রব্লেম!'
লুতফন শুধু ছেলের কথা শুনে নিজের বুক ফাটা অপমান মিশ্রিত কান্না গোপন করে। একদিন মোশাররফকে ফোন দিয়েছিল লুতফন। তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিলেও তাদের বেয়াই বেয়াইনের মতো সেরকম কোন সম্পর্ক ছিল না। তাকে নীচ চোখেই দেখত তাদের পুরো পরিবার। ছেলে মিষ্টি, কেন মিষ্টি তার কারণ তো আপনারা জেনে গেছেন কিন্তু মা তেতো কারণ লুতফন গরীব। ঐ বিয়ের সময় যা একটু নিয়ম কানুনের জন্য লুতফনকে পাতে নিয়েছিল— তারপর থেকে সব উধাও। লুতফন ও জোর করেনি, নিজের গাঁ ঘরে ছেলের ভাগ্যের কথা প্রথম প্রথম বয়ান করে বেড়িয়েছিল খুব। বিয়ের সময় তো গ্রামের লোকজন তাকে 'বড়লোকের বিহ্যান' বলে ঠাট্টা করত। বলত, 'ঢাকাতে থাকবি টে লুতফন? হামরাকে ফের ভুলিস ন্যা।' লুতফন ওদের ঠাট্টা তামাশাকে উপভোগ করত কিন্তু শেষ পরিনতি তাকেই তামাশার শালপাতা করে কুঁকড়ে দিয়েছে।
একদিন এসব সহ্য করতে না পেরে লুতফন মোশাররফকে কল দিয়েছিল— বলেছিল, 'হামার ব্যাটা তো এমন ছিল না জি ভাই?' মোশাররফ লুতফনের অভিযোগ উড়িয়ে বললেন, 'জীবনে এত ব্যাটা ব্যাটা করে দুঃখ করলে হবে, কপালে যা খেলছে তা মাইনা নাও!' এ কথা শোনার পর লুতফন আর কোনদিন মোশাররফকে কল দিয়ে ছেলের ব্যাপারে কিছু বলে না।
লুতফন ঝাড়াপায়ে হেঁটে এসে যখন পিঁপড়াডাঙার রাস্তায় তখন ভাটিবেলার সলতে নিভে আসছে — সে দেখল ডহারে বিয়ে বাড়ি কিংবা মরা বাড়িতে যেমন মানুষের ভীড় হয় তেমন মানুষের ভীড়। লুতফনকে আসতে দেখে সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠল। —এদ্দ্যা ইঞ্জিনিয়ারের বিহ্যান আইলো।
—তুমি এতক্ষণে আইল্যা জি বিহ্যান? ইঞ্জিনিয়ার যে চইল্যা গেল।' লুতফন কী ধরে কথা বলবে তা খুঁজে না পেয়ে বলল, 'হামার আসতে দেরী হইয়্যা গেল, হামার ব্যাটা আইসসিলো কি?'
'তোমার ব্যাটা বহু কেহুই আসেনি জি বিহ্যান' বলে লুতফনকে ঘিরে ধরে পিঁপড়াডাঙার লোকজন।
লুতফনের মুখ শুকিয়ে গেছে। মুখের ভেতর হাজারো প্রশ্ন এসে লাড়ু লাড়ু হয়ে যাচ্ছে৷ সে শুধু তাকিয়ে থাকল, বহু পুরাতন ভ্রমণ শেষে—সার্কাসের ক্লান্ত, আহত ভাল্লুকের মতো।
৬.
ইদন আজ সারাদিন টই টই করে নাচোল বাজারে ঘুরেছে। সন্ধ্যা হব হব সময়ে সে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফিয়ে নামে। এবং পুরাতন গোরস্তানের দিকে হাঁটতে থাকে। এমন টাকার মরা সে, সারাদিনে এক টাকাও খরচ করে খায়নি কিছুই৷ বাড়ি গিয়ে আখা ধরিয়ে যা করার করবে৷
গোরস্তানের আইলের মতো আনোসেড়ে সরু রাস্তায় হঠাৎ ইদনের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে, ইদন চোখ খুললেই দ্যাখে তার মাথাসহ গোটা দুনিয়াটা বনবন করে ঘুরছে৷ সে মাটি ধরে বসতে গিয়ে টলমল করে টাল খেয়ে একটা পুরাতন কবরে পড়ে যায়।
কবরে পড়ে ইদন ভয়ে আরও থরথর করে কাঁপতে থাকে, মনে করে তার মৃত্যু দূত আজরাইল তাকে সারাদিন তাড়িয়ে তাড়িয়ে এই গোরস্তানেই টেনে এনেছে— জান কবজের জন্য। তার দুনিয়া থেকে দানা উঠে গেছে, আর বাঁচবেনা সে।
তারপর ভয়ে আড়ষ্টভাব নিয়ে মনে মনে কালেমা পড়তে থাকে, ' লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'
ইদনের কবরে পড়ার শব্দে একটা শেয়াল নতুন কবরের খোঁজে এসে, একবার কী ভেবে এদিকে মুখ নামিয়ে গন্ধ শুকছিল! কিন্তু হঠাৎ মসজিদের পুরাতন মাইকের ঘড়ঘড়ে কর্কশ কণ্ঠে আজান পড়তেই শেয়ালটা ধীরকে গিয়ে পালিয়ে যায়।
ইদন তখনো আড়ষ্টভাব নিয়ে মৃত্যু ভয়ে কালেমা পড়ে যাচ্ছে , ' লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে। ঝিঝি ডাকছে। একটা মশার মথ চাকতির মতো ঘুরে ঘুরে মানুষের মাথা খুঁজছে। যে মাথাকে স্টেজ করে তারা কনসার্ট করতে পারে। ইদন খুব সতর্ক হয়ে চোখ খোলে। তারপর চোখ বড় বড় করে দেখতে থাকে মাথাসহ দুনিয়া বনবন করে ঘুরছে কিনা— কিন্তু সে দ্যাখে তার জগত একটি জায়গায় স্থির। মৃদু বাতাস ওঠায় বুনো ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে এসে লাগে। সে যে দাঁড়িয়ে কবর টপকে উপরে উঠে আসবে সে শক্তিটুকুও নাই। ইদন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল কিন্তু অবাক করার বিষয় যেটি— তা হলো শাদা মাইক্রোটার মতো আধখাওয়া চাঁদটা যেন ঝুলে আছে তার দিকেই।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

সোয়েটার
গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।

এখানে আসবে না কেউ
চেক - হ্যালো টেস্টিং - শুনতে পাচ্ছেন? শুনুন – জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে গেল। ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। দেওয়ালে ঘষটানির একটা শব্দ। পুরোনো বছর উড়ছে। আমি ৩১শে ডিসেম্বরে এসেই থমকে গেছি। বাইরে নতুন বছর চলছে, আমি পুরোনো বছরে। কীরকম অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয় ভাবে দেওয়াল ঘড়িটাও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।

অবনী বাড়ি আছো
“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?”