
১/তামার সিন্দুক
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ।
ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক।
কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে।
ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক।
পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।
আর দূরে কোথাও, অন্ধকারের মধ্যে, হাতির ডাকে পাহাড় কেঁপে ওঠা।
সেদিনও তেমনই একটা রাত নামছিল।
কালজানির ধারের পুরোনো ডিমা চা বাগানের একটি কালভার্ট মেরামতের কাজ চলছিল কয়েক দিন ধরে। সকালবেলা শ্রমিকরা মাটি কাটতে গিয়ে কোদালের ধাতব আঘাতের শব্দ শুনেছিল।
ঠং!
তারপর আবার।
ঠং!
মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল সবুজ হয়ে যাওয়া একটা ধাতব বাক্স।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল পুরোনো কোনো যন্ত্রপাতি।
কিন্তু বাক্সটা যতটা দেখা গেল, ততই বোঝা গেল, এটা সাধারণ কিছু নয়।
প্রায় সাত ফুট মাটির নিচে পোঁতা ছিল ভারী তামার সিন্দুকটি।
চাবির ছিদ্র নেই।
তালা নেই।
শুধু ঢাকনার ওপর একটি পুরোনো দিনের সামরিক প্রতীক।
আর তার নিচে খোদাই করা চারটি শব্দ।
“PROJECT SPHINX”
1943
খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
পরদিন খবর পেয়েই সকালেই চালসার সরকারি বাংলো থেকে একটি সাদা সরকারি গাড়ি এসে দাঁড়াল কালচিনির বাগানের কাছে।
গাড়ি থেকে নামলেন ড. সাবির জামান।
পেশায় প্রত্নতাত্ত্বিক। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। উত্তরবঙ্গের পুরোনো সামরিক স্থাপত্য এবং ঔপনিবেশিক সময়ের নিদর্শন নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা।
ঘটনাস্থলে তখন পুলিশ পাহারা। বাগানের শ্রমিকদের ভিড়।
সাবির নিচু হয়ে বসে সিন্দুকটির গায়ে হাত না দিয়েই ভালো করে দেখলেন।
মেজর রাই কোথায়?
পেছন থেকে গম্ভীর গলা এল।
এই তো।
সাবির ঘুরে তাকালেন।
মেজর কিষাণ রাই।
প্রাক্তন সেনাকর্মী। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পাহাড়ি রোদে পোড়া মুখ, চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত।
কালচিনি, রাজাভাতখাওয়া, ডিমা, নিমতি ও বক্সার জঙ্গল, জয়ন্তীর পাথুরে নদীখাত, রায়মাটাংয়ের জঙ্গলপথ, এই ভূখণ্ড তাঁর কাছে কোনো মানচিত্র নয়। হাঁটাপথ, নদীর খাত, হাতির চলার রাস্তা, শুকনো নালার গতিপথ, সব তাঁর চেনা।
রাই সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
এটা এখানে এল কী করে?
সাবির ধীরে বললেন,
সেটাই তো জানতে হবে।
তিনি দস্তানা পরে সিন্দুকটির ওপরের মাটি পরিষ্কার করলেন।
১৯৪৩।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
রাই মাথা নাড়লেন।
এই অঞ্চলে তখন ব্রিটিশদের সামরিক তৎপরতা ছিল। কিন্তু...
সাবির আঙুল দিয়ে খোদাই করা নামটির দিকে দেখালেন।
Project Sphinx-এর কোনো উল্লেখ আমি এখনো পাওয়া রেকর্ডে দেখিনি।
ঠিক তখনই দূরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
নীল রঙের জিপ এসে থামল।
জিপ থেকে নামলেন অনামিকা সেন।
তরুণ ইতিহাস গবেষক। হাতে মোটা বাদামি ফাইল।
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে এসে বললেন,
ড. জামান, আপনারা সিন্দুকটা খুলেছেন?
না।
ভালো করেছেন।
অনামিকা ফাইলটা খুললেন।
কারণ এটা শুধু একটা সামরিক বাক্স নয়।
সাবির তাঁর দিকে তাকালেন।
তাহলে?
অনামিকা একটা পুরোনো সাদা কালো ছবির কপি বের করলেন।
ছবিতে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ব্রিটিশ অফিসার।
ছবির পেছনে হাতে লেখা।
KALCHINI SECTOR
AUGUST 1943
অনামিকা নিচু গলায় বললেন,
এই ছবির লোকগুলো যুদ্ধের পর কোথায় গিয়েছিল, তার কোনো নির্ভরযোগ্য রেকর্ড নেই।
মেজর রাই ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আর Project Sphinx?
অনামিকা এবার ফাইল বন্ধ করলেন।
সেটা আরও অদ্ভুত।
একটু থেমে বললেন,
ফাইল অনুযায়ী, কালচিনির জঙ্গলের কোথাও একটা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা তৈরি হয়েছিল।
সাবিরের চোখ সরু হয়ে এল।
ল্যাবরেটরি?
সম্ভবত।
কীসের জন্য?
অনামিকা উত্তর দিলেন না।
শুধু সিন্দুকটির দিকে তাকালেন।
সেটা জানার জন্যই তো আমাদের নিচে নামতে হবে।
২/ ফিলড ম্যাপ
সিন্দুকটি খোলার পর ভিতরে পাওয়া গেল মাত্র তিনটি জিনিস।
একটি চামড়ায় বাঁধানো পুরোনো ফিল্ড ম্যাপ।
একটি পিতলের তৈরি অদ্ভুত কম্পাস।
আর একটি ডায়েরি।
ডায়েরির বেশিরভাগ পাতা নষ্ট হয়ে গেছে।
কিন্তু শেষ পাতাটি এখনও পড়া যায়।
তারিখ।
১৭ আগস্ট, ১৯৪৩।
হাতের লেখা কাঁপা।
শেষ কয়েকটি লাইন ইংরেজিতে লেখা।
We have sealed the entrance.
If the enemy finds it, everything we built here must disappear.
The river bend. The stone wall. The old forest path.
That is where Sphinx sleeps.
বাংলায় অর্থ যা দাঁড়ায়।
আমরা প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছি। শত্রুর হাতে পড়লে যা তৈরি করেছি, সবকিছু মুছে ফেলতে হবে। নদীর বাঁক। পাথরের দেওয়াল। পুরোনো জঙ্গলের পথ। সেখানেই ঘুমিয়ে আছে স্ফিংক্স।
পরদিন ভোরে তিনজন বেরিয়ে পড়লেন।
কালচিনির চা বাগান পেরিয়ে রাস্তা ধীরে ধীরে সরু হতে লাগল।
তারপর রাস্তা শেষ।
সামনে জঙ্গল।
মেজর রাই হাত তুলে বললেন,
এবার থেকে আমার কথা শুনবেন।
অনামিকা হেসে বললেন,
আপনি কি সবসময় এত আদেশ করেন?
জঙ্গলে গণতন্ত্র চলে না।
সাবির মৃদু হেসে ফেললেন।
কিছুদূর এগোতেই মেজর থেমে গেলেন।
মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
এখানে হাতি গেছে।
অনামিকা অবাক হয়ে বললেন,
কীভাবে বুঝলেন?
মাটির দাগ দেখুন।
তারপর তিনি আরও নিচু হয়ে শুকনো পাতার একটা স্তর সরালেন।
আর এটা দেখুন।
একটা মোটা ডাল ভাঙা।
তাজা।
জঙ্গল হঠাৎ যেন আরও নীরব হয়ে গেল।
কিছুদূর পর গ্যাস ডিটেক্টরটা শব্দ করল।
বিপ।
তারপর আবার।
বিপ।
বিপ।
অনামিকা যন্ত্রটির দিকে তাকালেন।
কিছু একটা আছে।
সাবির চারপাশে তাকালেন।
ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে একটা অস্বাভাবিক ধাতব গন্ধ মিশে আছে।
সামনে পাহাড়ের কালো দেয়াল।
লতা, ফার্ন আর শ্যাওলায় ঢাকা।
মেজর রাই ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে একটা বিশাল শিকড় সরালেন।
তার নিচে দেখা গেল লোহার একটা কিনারা।
পেয়েছি।
তিনজনই চুপ।
আরও লতা সরানো হলো।
ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল বিশাল একটি দরজা।
দরজার ওপর মরচে ধরা অক্ষর।
R.E.
1943
Royal Engineers.
অনামিকার গলা শুকিয়ে গেল।
এত বছর ধরে...
সাবির ফিসফিস করে বললেন,
এটা অপেক্ষা করছিল।
৩/গোপন দরজা
দরজাটা খোলার সময় কোনো নাটকীয় শব্দ হয়নি।
শুধু ঘরঘর শব্দ।
তারপর একটা দীর্ঘ ধাতব গোঙানি।
দরজা কয়েক ইঞ্চি খুলতেই ভেতর থেকে বরফের মতো ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।
মেজর রাই টর্চ জ্বালালেন।
আলো গিয়ে থামল পাথরের সিঁড়িতে।
সিঁড়ি নিচে নামছে।
আরও নিচে।
আরও।
মাস্ক পরে নিন, বললেন অনামিকা।
তিনজনই মুখ ঢেকে নিলেন।
প্রথম পঞ্চাশ ধাপ।
তারপর একশো।
তারপরও সিঁড়ি শেষ হচ্ছে না।
দেয়ালের কংক্রিটে শ্যাওলা।
কোথাও কোথাও পুরোনো বৈদ্যুতিক তার।
আর মাঝে মাঝে ছোট গোল ছিদ্র।
অনামিকা টর্চ ফেললেন।
এগুলো কী?
মেজর রাই বললেন,
পুরোনো ventilation?
সাবির মাথা নাড়লেন।
না।
তিনি দেয়ালের দিকে ঝুঁকে দেখলেন।
এগুলো ভেতরের কোনো mechanical system-এর অংশ হতে পারে। সাবধানে চলুন।
আরও কিছুদূর গিয়ে সিঁড়ি শেষ হলো।
সামনে বিশাল একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ।
একসময় হয়তো এটি ছিল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
দেয়ালে মরচে ধরা ডায়াল।
এক কোণে ভাঙা রেডিও সেট।
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুরোনো কাগজ।
আর মাঝখানে একটি কাচে ঢাকা ধাতব ক্যাবিনেট।
তার ভিতরে চারটি নীল কাচের কন্টেইনার।
অনামিকা এগিয়ে গিয়ে থেমে গেলেন।
এগুলোই...
সাবির হাত তুলে তাঁকে থামালেন।
কিছু ছুঁবেন না।
তিনি কন্টেইনারগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মেঝেতে পড়ে থাকা একটি নথি তুলে নিলেন।
পাতার ওপর লেখা।
SPHINX
BIOLOGICAL RESEARCH
সাবিরের মুখের রং বদলে গেল।
এটা গবেষণাগার ছিল।
মেজর রাই চারদিকে তাকালেন।
কী গবেষণা?
সাবির উত্তর দিলেন না।
অনামিকা ধীরে বললেন,
যুদ্ধের জন্য?
সম্ভবত।
ঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
হঠাৎ ঠাস করে একটা শব্দ হলো।
উপরে কোথাও পাথর ভাঙার শব্দ।
তারপর গর্জন।
মাটি কেঁপে উঠল।
৪/দশ মিনিট
মেজর রাই দেয়ালে হাত রাখলেন।
আরেকবার কেঁপে উঠল মাটি।
ধস।
অনামিকা তাকালেন।
কতটা সময়?
রাই ঘড়ি দেখলেন।
জানি না।
আনুমানিক?
তিনি এবার সরাসরি বললেন,
দশ মিনিট। হয়তো তারও কম।
সাবির কাচের ক্যাবিনেটের দিকে তাকালেন।
অনামিকা বললেন,
আমাদের এগুলো নিয়ে বেরোতে হবে।
না।
কিন্তু...
না, অনামিকা।
সাবিরের গলা এবার কঠিন।
আমরা জানি না এগুলোর ভিতরে কী আছে।
কিন্তু গবেষণার জন্য...
গবেষণার আগে মানুষ।
আরেকবার মাটি কেঁপে উঠল।
ছাদের একটা অংশ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল।
মেজর রাই চিৎকার করলেন,
এখনই বেরোতে হবে!
অনামিকা শেষবারের মতো কাচের কন্টেইনারগুলোর দিকে তাকালেন।
সাবির দ্রুত ক্যামেরা বের করলেন।
ছবি তুললেন।
একটার পর একটা।
নথির ছবি।
দেয়ালের লেখা।
ক্যাবিনেট।
পুরোনো রেডিও।
সব।
তারপর ক্যামেরা বন্ধ করলেন।
চলুন।
মেজর রাই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
অনামিকা পেছনে।
কিন্তু সাবির দাঁড়িয়ে রইলেন।
আপনি আসছেন না?
একটা কাজ বাকি।
কী?
সাবির ঘরের শেষ প্রান্তে তাকালেন।
সেখানে একটি পুরোনো লাল emergency lever।
মেজর রাই থেমে গেলেন।
না।
সাবির তাকালেন।
কী?
রাই ধীরে বললেন,
ওটা যদি এখনও কাজ করে...
তাহলে?
পুরো স্থাপনাটা ধসে পড়বে।
সাবির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
তাহলেই ভালো।
অনামিকা চমকে উঠলেন।
ড. জামান!
এই জায়গা আর কখনও খোলা উচিত নয়।
কিন্তু ইতিহাস...
সাবির শান্ত গলায় বললেন,
ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না।
তিনি লিভারের দিকে এগিয়ে গেলেন।
মেজর রাই অনামিকার হাত ধরে টেনে নিলেন।
চলুন!
তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন।
সাবির শেষবার কন্টেইনারগুলোর দিকে তাকালেন।
তারপর লিভার টেনে দিলেন।
৫/ কালচিনির ভোর
প্রথমে কিছুই হলো না।
তারপর মাটির গভীর থেকে এল এক বিকট শব্দ।
ধড়াম!
সিঁড়ি কেঁপে উঠল।
দেয়াল ফেটে গেল।
মেজর রাই অনামিকাকে ঠেলে ওপরে তুললেন।
দৌড়ান!
পেছনে ধসে পড়ছিল অন্ধকার।
একটা পাথর সিঁড়িতে আছড়ে পড়ল।
আরেকটা।
তারপর পুরো ভূগর্ভস্থ পথ যেন গর্জে উঠল।
তিনজন প্রায় একসঙ্গে দরজার বাইরে বেরিয়ে এলেন।
পরের মুহূর্তেই গর্জন।
পাহাড়ের একটা অংশ নেমে এল।
ধুলোয় ঢেকে গেল চারপাশ।
যেখানে কয়েক মিনিট আগে ছিল লোহার দরজা, সেখানে এখন শুধু পাথর, মাটি আর শিকড়।
অনামিকা হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়লেন।
মেজর রাই দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সাবির চুপ করে দাঁড়িয়ে।
কিছুক্ষণ পরে অনামিকা বললেন,
সব শেষ?
সাবির ধীরে মাথা নাড়লেন।
না।
তিনি কালজানির দিকে তাকালেন।
ভোরের আলো তখন জঙ্গলের মাথায় এসে পড়েছে।
সব রক্ষা পেল।
নদীর ওপারে কুয়াশা ধীরে ধীরে সরছে।
চা বাগানের সারিগুলো সোনালি হয়ে উঠছে।
দূরে কোনো অচেনা পাখি ডাকল।
কালচিনির জঙ্গল আবার নিজের স্বাভাবিক শব্দ ফিরে পেল।
মেজর রাই বললেন,
আপনি কি মনে করেন, ওরা সত্যিই সবকিছু নষ্ট করে ফেলেছিল?
সাবির তাকালেন না।
কারা?
যারা এই জায়গাটা বানিয়েছিল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সাবির বললেন,
একটা জায়গা ধ্বংস করা যায়।
তিনি মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পাহাড়টার দিকে তাকালেন।
কিন্তু একটা রহস্যকে?
অনামিকা তাঁর দিকে তাকালেন।
সাবিরের মুখে অদ্ভুত হাসি।
সেটা এত সহজ নয়।
সেদিন সন্ধ্যায় রাজাভাতখাওয়ার ছোট্ট বনবাংলোর বারান্দায় বসে অনামিকা ক্যামেরার ছবি কম্পিউটারে তুলছিলেন।
একটার পর একটা ছবি।
পুরোনো দেয়াল।
কন্ট্রোল রুম।
ক্যাবিনেট।
নথি।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
ড. জামান...
সাবির পাশের চেয়ার থেকে তাকালেন।
কী হয়েছে?
অনামিকা স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে দিলেন।
শেষ ছবিটি।
যেটা সে তুলেছিল লিভার টানার ঠিক আগে।
ঘরের একেবারে পেছনের দেয়ালে একটা অংশ দেখা যাচ্ছে।
সেখানে একটি দরজা।
খুব ছোট।
অন্ধকারে প্রায় চোখে পড়ার মতো নয়।
দরজার ওপর খোদাই করা।
SPHINX II
অনামিকার ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
সাবির অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
আমরা ভুল জায়গাটা বন্ধ করেছি।
বাইরে তখন ডুয়ার্সের রাত নেমে এসেছে।
জঙ্গলের ভেতর কোথাও হাতি ডেকেছে।
কালজানির জলে চাঁদের আলো কাঁপছে।
দূরে চা বাগানের অন্ধকার সারি।
আর কালচিনির পাহাড়ের নিচে,
মাটির বহু গভীরে, অন্ধকারের মধ্যে কেউ যেন দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

সোয়েটার
গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।

এখানে আসবে না কেউ
চেক - হ্যালো টেস্টিং - শুনতে পাচ্ছেন? শুনুন – জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে গেল। ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। দেওয়ালে ঘষটানির একটা শব্দ। পুরোনো বছর উড়ছে। আমি ৩১শে ডিসেম্বরে এসেই থমকে গেছি। বাইরে নতুন বছর চলছে, আমি পুরোনো বছরে। কীরকম অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয় ভাবে দেওয়াল ঘড়িটাও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।

অবনী বাড়ি আছো
“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?”