২৭ জুলাই, ২০২৬
শ্রাবণের কাব্য-ধারা
শ্রাবণের কাব্য-ধারা

        বর্ষার লাবণ্যময় পরিবেশে কবিহৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠেছে যুগে-যুগে। মায়াময় অলকাপুরীতে কবিমন বারবার ছুটে গেছে।  

                           কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতে’ পর্বতের ওপারে নির্বাসিত শূন্য ও একাকী জীবনে ‘মেঘ’কে দূত করে পাঠিয়েছেন প্রিয়ার কাছে।

                          'ও মেঘ, জানি আমি জাতকপত্রিকা, ভুবনবিখ্যাত পুষ্কর তোমার নাম জানি তোমার গুণপনা ইচ্ছামতো পারো উড়িতে

প্রধান ইন্দ্রের ও মেঘ, প্রিয়া দূরে, তোমার কাছে তাই প্রার্থী-

ক্ষতি কী গুণবানে বিফল হই যদি, অধমে গ্লানিময় যাচ্ঞা।'

- মেঘদূত (পূর্বমেঘ), অনুবাদ- শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

                          জয়দেব মেঘমেদুর অম্বরের কথা বলেছেন। বৈষ্ণব কবিরা বর্ষার পরিবেশে রাধিকার বর্ষাভিসারের চিত্র এঁকেছেন। 

                           'ঘনঘন ঝনঝন বজর নিপাত'-বর্ষণ মুখর অন্ধকারে 'এ ভরা বাদল মাহ ভাদর'-এর শূন্যতার ভেতর অনন্তের সন্ধান করেছেন। 

                           মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় বর্ষা আবার ধরা দিয়েছে প্রকৃতির অপরূপ শক্তি হিসেবে। তাঁর কবিতায় বর্ষার প্রকৃতি ও মানব প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়-

" গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর,

উথলিল নদনদী ধরণী উপর ।

রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে,

দানবাদি দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে।

সমীরণ ঘন ঘন ঝন ঝন রব,

বরুণ প্রবল দেখি প্রবল প্রভাব ।

স্বাধীন হইয়া পাছে পরাধীন হয়,

কলহ করয়ে কোন মতে শান্ত নয়।।"

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন  -

 

'বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে

ছেলে বেলার গান

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

নদে এল বান।’

 

আবার তিনি এ বর্ষাকেই বেছে নিয়েছেন প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদনের উত্তম সময় হিসেবে-

‘এমন দিনে তারে বলা যায়

এমন ঘনঘোর বরিষায় -'

 

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বর্ষা ধরা দিয়েছে -

'ওগো ও কাজল মেয়ে

উদাস আকাশ ছলছল চোখে তব মুখে আছে চেয়ে

কাশফুলসম শুভ্র ধবল রাশরাশ যেত মেঘে

তোমার তরীর উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে

ওগো ও জলের দেশের কন্যা তবও বিদায় পথে

কাননে কাননে কদম কেশর ঝরিছে প্রভাত হতে

তোমার আদরে মুকুলিতা হয়ে উঠিল যে বল্লরী

তরুণ কণ্ঠে জড়াইয়া তারা কাঁদে দিবানিশি ভরি।'

 

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন-

‘এই জল ভালো লাগে;বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে

ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল- চোখের উপরে

তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে

ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে।'

 

জসিমউদ্দীনের কবিতায় বর্ষা এসেছে অন্যরকম ব্যঞ্জনায়। 

‘গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়

গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!

……………………………………………………

……………………………………………………

বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরুগুরু মেঘ ডাকে,

এসবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর কোন রূপ আঁকে।’

 

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছেন -

 

'অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে

মনের মাটিতে, বৃষ্টি ঝরে

রুক্ষ মাঠে, দিগন্ত পিয়াসী মাঠে

স্তব্ধ মাঠে, মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার

মাঠে, ঝরে বনতলে, ঘন শ্যাম রোমাঞ্চিত

মাটির গভীর গূঢ় প্রাণে, শিরায়-শিরায়

স্নানে, বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।'

 

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন -

'শ্রান্ত বরষা, অবেলায় অবসরে

প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া;

স্বর্ণ সুযোগে লুকোচুরি খেলা করে

গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।'

 

বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন  -

'নদীর বুকে বৃষ্টি পড়ে

জোয়ার এলো জলে;

আকাশ ভরা মেঘের ভারে

বিদু্যতের ব্যথা

গুমরে উঠে জানায় শুধু

অবোধ আকুলতা।'

 

শামসুর রাহমান বলেছেন -

'শ্রাবণের মেঘ আকাশে আকাশে জটলা পাকায়

মেঘ ময়তায় ঘনঘন আজ একি বিদু্যৎ জ্বলে

মিত্র কোথাও আশেপাশে নেই শান্তি উধাও

নির্দয় স্মৃতি মিতালি পাতায় শত করোটির সাথে।'

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন -

'বাইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, আজ তুমি ঐ রুপালি শরীরে

বৃষ্টি দেখবে প্রান্তরময়, আকাশ মুচড়ে বৃষ্টির ধারা...

আমি দূরে এক বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছি, একলা রয়েছি

ভিজেছে আমার সর্ব শরীর, লোহার শরীর, ভিজুক আজকে

বাজ বিদু্যৎ একলা দাঁড়িয়ে কিছুই মানি না, সকাল বিকাল

খরচোখে আমি চেয়ে আছি ঐ জানলার দিকে, কাচের এ পাশে

যতই বাতাস আঘাত করুক, তবুও তোমার রুপালি চক্ষু-

আজ আমি একা বৃষ্টিতে ভিজে, রুপালি মানবী, দেখবো তোমার

বৃষ্টি না ভেজা একা বসে থাকা।'

 

মহাদেব সাহা লিখেছেন -

‘এই যে জীবন উজাড় করে বর্ষার মেঘের মতো

তোমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছি

তুমি কখনোই তার কিছু অনুভব করলে না।'

 

'ঢাকার আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন, মাধবী এখন তুমি বাইরে যেও না

এই করুণ বৃষ্টিতে তুমি ভিজে গেলে বড় ম্লান হয়ে যাবে তোমার শরীর

এ বৃষ্টিতে ঝরে যদি কারও হৃদয়ের আকুল কান্না, শোকের তুষার

গলে গলে যাবে এই বৃষ্টির হিমে তোমার কোমল দেহের আদল

মাধবী বৃষ্টিতে তুমি বাইরে যেও না

মাধবী তুষারপাতে বাইরে যেও না।'

 

শঙ্খ ঘোষ বলেছেন -

'এখন বর্ষাকাল। দিন

প্রলম্বিত একটা বর্ষণ

আঁধারিম স্তব্ধ আর মূক অনিঃশেষ

 

তা যাবতীয় দৃশ্য এবং উজ্জীবন

যথার্থ এবং অনিবার্য

একটি দৃশ্য এবং একটি উজ্জীবনের

 

নিশ্চয়তার দীর্ঘ দীর্ঘ অবসন্ন

অবসন্ন আর অতলান্তিক

আর চিরায়মান একটা বিস্তীর্ণতার

 

অর্থাৎ অনতিক্রমণীয় একটা বর্তমানের

শিকড়ের সঙ্গে যত সংশ্লিষ্ট

করতে চাইছে ততো প্রলম্বিত অনির্ভর

 

জলধারা ; ওই প্রান্তর, ওই

বাসভূমি, ওই সিক্ত গাভী

তার মন্থর আর একলক্ষ্য কন্ঠ

 

ঘনিয়ে তুলছে একটা শিখা—সাদা

আর অতিমানী আর ঘোষিত

ঠিক যেমন এপার–ওপার শ্রাবণমাস, তা

 

এমন একটা সংবেদন যা স্পষ্টতই

তামস অস্বীকার, উত্তপ্ত

নীল সরু শিখার মতো অভ্রান্ত —

 

এখন বর্ষাকাল আমরা প্রশ্নাতীত

সহানুভূতিশীল, আমরা

যত আকন্ঠ নিমজ্জিত তত অনিবার্য

 

সেই বর্তমান— বর্তমান ব্যতীত

আর কিছুই নয়,কেবল

নিঃসংশয় একটা বর্তমান —ভেজা শালিক পাখি

 

নিমগাছের কাক,ঘরের কোণের চড়ুই

অবিসংবাদিত এই বর্তমান

আর সেই শিখা উত্তপ্ত অভ্রান্ত অশ্রুসজলতা।'

 

                    বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ পার হয়ে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বহু কবি বর্ষা নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বহু কবিতা লিখে চলেছেন।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

আমার রবীন্দ্রনাথ
ভবেশ বসু

আমার রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ হলেন জ্ঞান ও বোধ। তোমাদের আঁচলে কি ? কি বাঁধা আছে ? জ্ঞান ও বোধ বেঁধে রেখেছো কেন ? আঁচলে চাবি গোছা।তার সাথে রবীন্দ্রনাথ।সকল মায়ের আঁচলে বাঁধা।সন্তান ছুটতে ছুটতে চলে এল।চোখে ঘাম।মুখে ঘাম।পায়ে ধুলা।ছেলে মেয়ের পৃথক গামছা।গামছায় ছেলে মেয়ে পরিস্কার হল।  মা ওদের তো রবীন্দ্রনাথ দিলে না ? রবীন্দ্রনাথ গামছায় নেই।রবী আছেন আঁচলে।

গদ্য৭ মে, ২০২৪
রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ
সব্যসাচী হাজরা

রঞ্জিত কথা - শঙ্খ ঘোষ

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি-র সেই কথা মনে পড়ে –‘আমাদের ভিতরের এই চিত্রপটের দিকে ভালো করিয়া তাকাইবার আমাদের অবসর থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে ইহার এক-একটা অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অন্ধকারে অগোচরে পড়িয়া থাকে’। সেই অন্ধকারে এঁকে রাখা ছবিগুলো যা রঞ্জিত সিংহ’র ভেতরে একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছিলো, আমি সেগুলোকেই আলোয় আনতে চেয়েছি। ‘রঞ্জিতকথা’ তাই।

গদ্য৩০ আগস্ট, ২০২৪
 গাছ
হিমাংশু রায়

গাছ

চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল।  সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।

গদ্য৭ মে, ২০২৪