তরমুজ ব্যবসায়ী হারুনের সাথে যখন আমেনার বিয়ে হয়, সেই বছরের মাঘ মাসের শীতে আলেয়ার আলো খুব দেখা যাচ্ছিল। দূরে তাল,নিম আর শিরিষগাছের ফাঁক দিয়ে আলেয়ার আলো নিভু নিভু—কেঁপে কেঁপে সম্ভ্রমে লজ্জায় হেঁটে উধাও হয়ে যেত। মনে হত কেউ মধ্যরাতে চার্জহীন টর্চ লাইটটাকে থাপড়াতে থাপড়াতে ; পেটের ভুটভাট অত্যাচার থামাতে পায়খানার দিকে যাচ্ছে।
এর কিছুদিন পর প্রকৃতির নিয়মে দেহ লচপচে করে দেওয়া গরম পড়ল। আর সেই গরমকালে আমনুরা বাজারে হারুনের দেহ ঢেকে গেল পালা লাগা তরমুজের পিরামিডে। গোপনে একটা স্ত্রী পাওয়ার জন্য হাহাকার কিংবা পায়তারা নিয়ে ব্যবসা করতে বসা হারুনের ভেতরের কাহিনি কলাপ অজানা অখ্যাত এক গুহাচিত্র বললে ভুল হবে না। ইদানীং কোন কারণ ছাড়াই হারুনের বুক চিনচিন করে ওঠে। স্টেশনের পেছনে লাল ইটের মোটা দেয়ালের কাছে যেখানে লেখা আছে, 'প্রশ্রাব করিলে ৫০ টাকা জরিমানা' অথবা 'নুনু মিয়ার ব্যবস্থা নেয়া হইবে' জাতীয় কিছু কথা৷ সেখানে গিয়ে হারুন নির্দ্বিধায় লুঙ্গি তুলে বসে পড়ে, সে লক্ষ্য করেছে পেশাব করতে গেলে জ্বলে। হারুন বুক চিনচিনের কারণ প্রেমজনিত ধরে নিলেও হঠাৎ পেশাব জ্বলার কারণ বুঝতে পারল না। হকারের কাছে এক ফাইল অশ্বগন্ধা বীজের গুঁড়া কিনে খেয়েছে কাজ হয়নি। ফার্মেসীতে এই সমস্যা বলে ওষুধ কিনতে গেলে যদি ফার্মেসীওলা তাদের গ্রামে বলে দেয় এই ভয়ে হারুন ফার্মেসীমুখি হয় না। এখন গরমের সিজনে যে হারে পঁচা ফাটা তরমুজ খাওয়া হচ্ছে তাতে করে এই মূত্র রোগ হওয়ার কোন কারণ দেখেনা হারুন। আর কী এক জ্বালা বিয়ে করতে যাওয়ার মুখে এই সমস্যা! মানুষ শুনলে আড়ালে হাসাহাসি করবে। এই কথা কাউকে বলা যাবে না। হারুন মনে মনে এসব কল্পনা করে পেশাব করতে বসে।
—কী বে হারুন্যা খরিদ্দার রাইখ্যা কী তুই খালি মুইত্যা বেড়াবি বে!
হারুন কথায় কান না দিয়ে লুঙ্গির নিচে হাত ভরে কুলুপের ঢিল নিয়ে হাঁটতে থাকে। তার হাঁটা দেখে আরেকজন হাঁক মারে,'কই বে হারুইন্ন্যা!'
এবার আগন্তুক লোকটির হাঁক শুনে হারুনের মনে ঘুরতে থাকা দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে গেল। চকচক করে উঠল মুখ যেন মেঘ সরে বহুদিন পর রোদ উঠে চমকে দিয়েছে জমিন। লোকটির কাছাকাছি কুলুপের ঢিল ধরেই এগিয়ে গেল সে। পাঁচ পা দুরত্ব থাকতেই বাম হাত লুঙ্গির ভেতর থেকে হাত টেনে কুলুপের ঢিলটা পাশের পুকুরে ফেলল। ঢিলটা পড়াতে টুপ করে একটা শব্দ হল আর সেই শব্দে কয়েকটা বতক প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে উঠে এল ডাঙায়। বতকের ডাঙায় উঠে আসার ফাঁকে হারুন সেই আগন্তুকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। 'সালা মালাইকুম, কেমন আছেন জি ভাই?' আগন্তুক হারুনের কালো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কি বে বহুর সোনো পাউডার মুখে মাখছিস নাকি?'
—না জি ভাই! বহু কুন্ঠে পাইনু?
—ধলো লাগছে যে বে খুব!
—বেশি বেশি তরমুজ খাছি এল্যাগ্যা বোধয়! হারুন মৃদু হেসে বলল।
আগন্তুক মজার ছলে আরও কিছু প্রশ্ন করে, তারপর দুজনেই দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
—চাঁপাইতে বহু দেখ্যাছি! তোর তো খুব সখ?
হারুন খানিকটা লজ্জা পায়। তার পাশ থেকে কাট সমুন্দি গলা বাড়িয়ে বলে, 'হারুন্যার বরিন্দ্যা বেটি পসন লয়, শহুর্যা বেটি থাপার খুব সখ!' এবার হারুন পায়ের সেন্ডেল তুলে তাকে দিখিয়ে বলে, 'অই চুদির ভাই নিজে যে শহর থ্যাক্যা বিহ্যা কইর্যা লিয়ে আইসসো।' সেই লোক পিছু হটে বলে, 'কেনে বিহ্যা কর্যাছি তোকে এর কাহানি সামনের হাটে কহব বে।'
আগন্তুকটি হারুনের ঘনিষ্ঠ, নাম তরিকুল। মাটি বেচা কিনার ব্যবসা করে। রহনপুর বাড়ি। জমির দালালি করেই দশ-বারো বিঘার মতো জমি কিনেছে। দুই ছেলে। বড়টি খুলনায় রাজমিস্ত্রীর কাজে গেছে আর ছোটটি স্কুলে। এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তরিকুলের অভিযোগ তার মাথা পঁচা ওকেও বড় ছেলেটির মতো কাজে লাগিয়ে দিবে। তরিকুলের কথা, 'অরা অরঘে মতোন কইর্যা খাইক!' হারুন বলে, 'তোমার দেখা নাই, ফোন ও ধরনা।'
—আর কহিসন্যা গোদাগাড়ী গেছিনু একটা কামে, যে পাটির হয়্যা গেছিনু ও শালা আবার অন্য দালাল ধর্যাছে। দালাল ধইর্যাছিস বোকাচোদনা ভালো কথা কিন্তু যে দালালের কথা তারা কহিলে আসলে অরা ধাপ্পাবাজ। দু'দিকে পাটি ধরে, আর যেদিকে ভারি হইবে সেদিকে হাইল ধর্যা জমি বিকিয়্যা দিবে৷ অই জমিটার দরুন কথা কহিতে গেছিনু৷ ফোনে তো আর সব কথা কহা যায়ন্যা৷ তরিকুল একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল। আর তা শুনে হারুন ও মাথা নেড়ে গেল।
—যে তিরফুট রইদ আইসো তরিকুল ভাই তরমুজ খাও!
—আজই খাওয়াবি? হামার ফের একটা লোক আসবে। জরুলি কথা আছে অর সোতে। শুন হামি কাইলক্যা তোরঘে বাড়ির দিকে যাব। আইজ ছ্যাড়া দে।
তরিকুল বেরিয়ে যাওয়ার সময় হারুন তার হাত চেপে ধরে। কানের কাছে নিচু স্বরে বলে, 'হামার একটা সমস্যা হয়্যাছে জি ভাই, পেশাব করতে গেলে জ্বলে। কুন ডাক্তার দেখাব!'
তরিকুল হাসতে হাসতে বলে, 'এটা কুনু সমস্যা হইল? বিহ্যা কর তোর পেশাবের জ্বালাপুড়া সব ঠিক হইয়্যা যাইবে। এই বয়সে এগল্যা একটু হয়।' হারুন এবার তরিকুলের হাত ছাড়ে। তারপর গামছা দিয়ে মাছি তাড়িয়ে হাঁক মারে, 'তরমুজ! তরমুজ! মধুর মতো মিষ্টি আর ভিতর রক্তের মতো লাল!'
২.
কাঁসারিপাড়ার চারপাশে দোতলা তিনতলা বিল্ডিংয়ের মধ্যে টিনশেডের বাড়িটা আমেনাদের। বয়স পঁচিশের পরে বিয়ে হওয়ার আগে যখন তার বয়স বিশ কী একুশ, তখন থেকেই সে বুড়ি বলে পাড়ায় পরিচিত ছিল। তার সাথকার কমবেশি সবার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তাকে প্রায়ই এই কথাগুলো শুনতে হত৷ তার উপর দিনদিন তার পেট ফুলে যাওয়ায় তাকে টেপি বলে ডাকত। যখন তার প্রথম পিরিয়ড হল। তার পরে অনিয়িমিত ভাবে বেশ কয়েকবার হয়৷ এরপর আর কবে হয়েছিল আমেনা নিজেও সেকথা মনে করতে পারে না। সেই ব্যথা সেই রক্ত তার আর চোখে দেখা বা অনুভব করা হয়নি। আমেনা তার অনিয়মিত পিরিয়ড নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। ওর মা বলেছে ওসব ঠিক হয়ে যাবে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিতে গিয়ে মিষ্টি গুলির ওষুধ কয়েকমাস খাওয়ার পরে আর খায়নি আমেনা। ধৈর্য ধরে খেতে হয় ওসব ওষুধ। কাঁসারিপাড়ার লোকজন বলেছে মেয়েটাকে গাইনি ডাক্তার দেখাও। আমেনার মা রহিমা বলেছে,' ও ঠিক হয়্যা যাইবে জি, হামার অত দায় পরেনি আর টাকাও নাই। বিহ্যা দিয়্যা দিব অর স্বামীতে তখন খরচ করবে৷'এই নিয়ে প্রায়ই মা বেটির কথা কাটাকাটি হয়। আমেনা ঝগড়া করে বলে, 'হামার বিহ্যা দিয়্যা দে!'
কার্তিক মাসের শেষে হারুনের পছন্দ হয়ে যায় আমেনাকে। একে তো চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের মধ্যে বাড়ি তার উপর আমেনার রং ফরসা, আর দেখতে শুনতে খারাপ না চলবে। হারুনকে আমেনার ঠোর দেয় আরৎ এর একজন ক্রেতা, যে কিনা গ্রামে গ্রামে তরমুজ বিক্রি করে বেড়ায়৷ কাঁসারিপাড়ায় তরমুজ বিক্রি করতে এসে আমেনাকে দেখে, আর সেই দেখার সুবাদে রহিমার সাথে কথা বলে মোবাইল নম্বর নিয়ে যায়। কথাবার্তা চলে তারপরই বিয়ে! এক দেখাতে আমেনার কোন খুঁত না বের করে বিয়েতে রাজি হওয়ায় কাঁসারিপাড়ার মানুষের বক্তব্য, 'বরিন্দ্যা মানুষ সুন্দর অসুন্দর খুব একটা বোঝেনা।' অবশ্য নতুন শাড়ি পরে ছিল বলে আমেনার পেটটা বোঝা যায়নি। আমেনারও হারুনকে পছন্দ হয়। হারুনের নিজের ব্যবসা, জমি আছে। অভাব কুকুর ছিনাড়ি করতে পারবেনা।
বিয়েতে পঞ্চাশ হাজার টাকা ডিমান্ড দাবি করে হারুনের বাপ। রহিমা অনেক কঁচলে কুঁচলে তাতে রাজি হয়ে আমেনার বিয়ে দিয়ে দেয়৷ কারণ সুজনি সেলাই করে এই টাকা আমেনাই জমিয়েছিল। আলাদা করে বিয়েতে ডুলিবিবি বরযাত্রীদের খাওয়ার খরচটায় যা করেছিল রহিমা। হারুন যৌতুকের টাকা পেয়ে খুব খুশি। বিয়ের পর নিজের গ্রামে ঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায়, চাঁপাইয়ের বুক থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে বিয়ে করে এসেছে। লোকজন হারুনের কথায় হিংসা করতে করতে বিরক্ত হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশনের আরৎ—এ তরমুজের বায়না দিতে আসলে শ্বাশুড়ির বাড়ি ফল মিষ্টি আর বয়লার মুরগি নিয়ে যায় হারুন। জামাইয়ের এসব জিনিস আনা দেখে রহিমা খুশিতে জামাইয়ের চৌদ্দগুষ্টির প্রশংসা করে।
এভাবে বছর ঘুরে পরের অগ্রহায়ণে ঝামেলা বাধে। সেবছর আলেয়ার আলো খুব একটা চোখে পড়েনি। ঝামেলার কারণ বেশ অনেকগুলো তারমধ্য প্রধান দুটি হল, প্রথমত— আমেনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল হারুন কিন্তু তার পিরিয়ড সমস্যাটা খুব বড় প্রভাব ফেলেছে, এই জন্য তার বাচ্চা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত— সে হিংসুটে ঝগড়া করে শ্বশুর শ্বাশুড়িকে জুদা করতে চায়৷ দ্বিতীয় কারণটি তার খেটে যেত যদি আমেনার বাচ্চা হত। হারুন আমেনার কোন কিছুরই ত্রুটি রাখেনি কিন্তু দিনদিন তার পেট এবং মুখের মাংস বেড়েই যাচ্ছিল।
একদিন ভরদুপুরে রান্না শেষে ছোট একটা বিষয় নিয়ে অন্যান্য দিনের মতো আজও ঝগড়ার মহড়া চলছিল। এক দুই করতে করতে হঠাৎ হারুনের বাপ আমেনাকে বলল,'কী বেটিছ্যাল্যা খালি মুখ চলে প্যাটে কিছুই নাই।' আমেনা শ্বশুরের কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ঝাটা চালিয়ে মারে। আর ঝাটাটা লাগবি কি লাগ একেবারে হারুনের বাপের মাথায় এসে লাগে। বয়স্ক মানুষের গলা ফাটা চিৎকারে পাড়ার মানুষ জুটে যায়। হারুন আসে। ঘটনা শুনে কোন কথা না বলে বাপকে মারার অজুহাতে আমেনাকে তার মায়ের কাছে কাঁসারিপাড়ায় রেখে যায়৷ আমেনা ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু না, হারুন লোক পাঠাল বিচার শালিশের মাধ্যমে তাকে তালাক দিবে। এটা শুনে আমেনার মাথার পোকা নড়ে উঠল। সে বারবার ফোন করেও হারুনের তালাশ পায়না। কান্নাকাটি আর আরৎ—এর লোক ধরে, অনেক জোরাজুরির পর হারুন আমেনার সাথে দেখা করে। আমেনা হারুনকে জড়িয়ে ভালবাসার কথা বলে, হারুন চুপচাপ আমেনার কান্না আর কথা শুনে গেল। শেষে হারুন বলল, 'তোমার যদি ছ্যালাপিল্যা হইতোক তাহিলে একটা সম্ভবনা ছিল। পুয়াতি হওয়ার বাহানা দিয়্যা লিয়া যাইতুন। হামি তোমাকে লিব না। যদি তোমাকে লিয়া যাই তাহিলে হার বাপ মা ঘাসমারা বিষ খাইয়্যা আত্মহত্যা করবে। তারা বিছানায় সেই বিষ লিয়া শুতে।' আমেনা হেচকি তুলে কান্না ছাড়া আর কিছু বলতে পারল না। হারুনের চলে যাওয়া তার কান্নারত চোখে অস্পষ্ট আর ঝাপসা লাগছিল।
রহিমা দেখল ওরা আর আমেনাকে নেবেই না। বেটির লজ্জা ঢাকতে যা করার দ্রুত করে নিতে হবে তাছাড়া উপায় নাই৷ দোষ যে 'লাগনি বেটির!' আরৎ—এর মানুষের মাধ্যমে দিন ঠিক হল, হারুন তার গ্রাম থেকেও লোকজন নিয়ে এল। এর ভেতর আমেনা এলাকার সকল মোড়লের বাড়ি দিনে তিনবার হাজিরা দিয়ে অনুরোধ করতে লাগলো বিচারে যেন আমেনার কপালে স্বামী সংসার জোটে।
গ্রামের মোড়লরা বলল, 'তোর ঝাটা মারাটা ঠিক হয়নি অই বাহানায় তারা এই পরিস্থিতিতে এসেছে। আর বড় কারণ তোর বাচ্চা হয়না তাই তারা আরও আগ্রহী ছাড়াছাড়িতে। এটা যে অরা মুখ ফুইট্যা কহ্যা দিয়াছে রে!'
৩.
ডিমান্ডের পঞ্চাশ হাজার টাকা ও খোরপোষ বাবদ সব মিলিয়ে আশি হাজার টাকায় সব মীমাংসা হয়ে গেল। দানে দেয়া কাঁসাপিতলের জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেয়া হল। আমেনা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে এই শালিশ মানেনা। আমেনার এসব কান্নাকাটিতে নিজের মা রহিমা বলল,'উঠ! উঠ! দেখ্যাশুইন্যা হামি ফের তোর বিহ্যা দিয়্যা দিব।' হারুনকে দেখে মনেই হল না এতদিন তারা সংসার করেছে। তাকে চিন্তামুক্ত দেখাচ্ছিল। ছাড়াছাড়ির পর থেকে আমেনা ভবঘুরের মতো হয়ে রাস্তায় রাস্তায় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঁক দিতে লাগলো। আমেনা যত হাঁটে মানুষ বলে,' ওর পায়ের সুতা ছিড়ে গেছে নইলে দিনরাত অটো রিক্সাতে না চড়ে এভাবে হাঁটতে পারে!' কাঁসারিপাড়ার লোকজন এও বলে, 'ছুড়িট্যার মাথা গ্যাছে!'
দুই খোপের ঘরে আমেনা একটা ঘর নিজের দাবী করে দখল করে থাকে, এদিকে বড় ভাই দুলাল বিয়ে করেছে বউ ঘরে৷ মাদক বিক্রির দায়ে দুলালকে পুলিশ গ্রেফতার করে৷ বউটা মায়ের বাড়ি চলে গিয়ে বাপের কাছে কিছু টাকা ধান্দা করার চেষ্টা করেছিল। স্বামীকে জেল থেকে ছাড়াতে হবে৷ কিন্তু বউটার বাপ মা বিরক্ত। বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণের একটি তারা খুবই গরীব। ভ্যান চালিয়ে সংসারটা চলে কোনমতে, মা সুজনি সেলাই করে। এসব করে কিছু টাকা জমিয়েছিল। প্রথমবার যখন একই কেসে জেলে গেল, মেয়ের মতো তারা স্বামী স্ত্রী হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে কেঁদেছিল। প্রথমে তারা এসবের কিছুই বুঝতে পারেনি। কী করবে অভাবের সংসার, মেয়েকে যদি ছাড়িয়ে নেয় তাহলে আবার ঘরে আসবে আর এবার সে একা আসবে কী? সাথে তিনবছরের মেয়ে৷ কে টানবে এত টানা। মেয়ে বাড়িতে আসলে কখনো ছেড়ে নেব এই কথা বলে না। বলে, 'দুখ কপালে লিয়ে এসেছিস সংসারটা কর্যা লে বেটি!' মেয়েটি চুপ করে শুধু শোনে৷ একটা চুইটক্যা ফুইটক্যা মাদক সাপ্লাইকারী তার স্বামী।
মায়ের সংসারে আমেনার এটা ওটা সরিয়ে রাখার অভ্যাস। যাকে বলে হাতলপটি মেয়ে। একদিন রহিমার মুরগি কেনার টাকা সে চুরি করে নেয়। এই নিয়ে সন্ধ্যার পর ঝগড়া। এক কথা দু কথা করতে করতে আমেনার ছোট ভাই নাজিম তার চুলের মুঠি ধরে পিঠে গুম করে কিল বসিয়ে বলে,'বাড়ি থেকে বাহির হ শালি, চুন্নি মাগি, হামি বিহ্যা করব তোর ল্যাগ্যা করতে পারিন্যা।' আমেনা হাউমাউ করে কাঁদে। তার চটুল কান্না তারা জানে৷ নাজিম একটা লোহার শিক নিয়ে তার ঘরে গিয়ে টিনের ট্রাংকের তালা ভাঙতে যায়। আমেনা চেঁচিয়ে ওঠে। কান্না মুছার জন্য হারানো ওড়না খুঁজে চোখ মুছে তার মাকে বলে, 'তোর জারুয়া ব্যাটাকে থামা। হামার ট্র্যাংকে জেনে হাত না দ্যায়!'
রহিমা বলে, 'তুই টাকা কেনে লিলি টে? তোর জ্বালা আর সহা যায়ন্যা। এমনি হারুন তোকে ভাত দেয়নি!' আমেনা কাঁদতে কাঁদতে বলে, 'ওখানে হামাকে ছাড়ার টাকা আছে। হামি টাকা লিনি, যখন হাকে দাগ দিছিস হামি ফেল্যা দিছি টাকা৷' রহিমা এবার নাজিমকে ডেকে বলে, 'থাম শোরের ব্যাট্টা শোর, তোর টাকা ফেলা দিছে। এভাবে কেহু বড় বহিনকে মারে!' নাজিম বলে, 'তোর চুন্নি বেটিকে ম্যারাছি।' আমেনা তার ঘর থেকে চিল্লিয়ে বলে, 'তুই হাকে মারলিরে জারুয়া তোর হাতে কুঢ়িকুষ্ঠ পড়বে। তুই ও তো মিরের বাগানের আম চুরি কর্যা মোবাইল কিনলি।' নাজিম দৌড়ে যায় মারতে, রহিমা তাকে থামায়। নাজিম বলে,'শালিকে থামতে কহা নাহিলে ওর মুখ ফাটিয়্যা দিব।'
ছোট ভাইয়ের হাতে মার খেয়ে আমেনা বাড়ি ছাড়ে। কিন্তু কাঁসারিপাড়া ছাড়ার কোন ইচ্ছা তার নাই। এ পাড়াতেই একটা ঘর ভাড়া করে থাকছে সে। দিনরাত রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো তার কাজ। হাতে একটা ফোন সবসময়, খুবই ব্যস্ত সে। ইদানীং আইবারিগিরি করছে। মায়ের পেশাটা ধরেছে৷ ফোনে কথার ভুজা ভেজে উড়ে বেড়ায়। পরিচিত সামনে কেউ পড়লে আমেনাকে জিগ্যেস করে, 'কুন্ঠে?' তার উত্তর,'এদ্দ্যা সামনে এখানে একটু কাজে!' গন্তব্যের কথা গোপন করে একটাই উত্তর, 'সামনে একটু যাব জি।'
মায়ের বাড়ি ছাড়লেও নিরাপত্তার জন্য তার ট্রাংকটি এখানেই রেখে গেছে। ভাড়া ঘরে নিয়ে যায়নি। চুরির ভয়ে৷
আমেনা কী এত সহজে বাড়ির জড় ভুলতে পারবে! প্রতিদিন চলে আসে। তার আসা দেখে নাজিম বলে, 'মাগে তোর চুন্নি বেটি ফের আইলো।' আমেনা বলে, 'তুই এত ত্যাপ্যান্যা কেনে বে? যখনি আসি তখনই তোর কুহুরার কথা উঠ্যা যায়!' ফট করে রহিমা বলে, 'তুই কদ্দিন আসিসন্যাতো টে। তুই না আসলে বাড়ি ঠাণ্ডা থাকে৷' দুলালের বউ রহিমার কথা শুনে হাসে এবং খুশিও হয়। কারণ আমেনা আসলেই ঘর দখলের খেলা চলে। আমেনা কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে গিয়ে বলে, 'হামি কি এমনি আসি! দোকানে তরি তরকারি কিনতে আসি।' রহিমা বলে, 'তোর ওখ্যানে তরকারি পাওয়া যায় ন্যা কহছিস! কত ভ্যানওলা গড়গড়িয়ে ব্যারাইছে!' আমেনা মুখ ক্যাচম্যাচ করে উত্তর দেয়, 'চুপ তো গে, চুপ তো!'
দুদিন পরপর দারিদ্র্য পীড়িত টিনশেডের বাড়িটাতে ডুগিডেহাটা লেগেই থাকে। দুলালের টেনশনে রহিমা উকিল ধরে বেড়াচ্ছে৷ উকিল বলেছে, 'এবার ভারি কেস দিয়েছে। তোমার ছেলের সাহস হয় কিভাবে? বিদেশ নাকি যাবে! যে কেস পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে যাবে৷' রহিমা কাঁদে, 'অভাবের সংসার জি ভাই। বাপ থ্যাকাও নাই। জারুয়া, বহু থুইয়া হামাকে বিহ্যা কইর্যা এখুন সংসারে একটা টাকাও দেয়না। কত দুখ ক্যাটা ব্যাটা বেটির্যাকে মানুষ করনু। এখনো যুদি দুখ কাটি তাহিলে কি কইর্যা হইবে কহ তো জি ভাই! হামি বেটিছ্যালা মানুষ কিভাবে এত দেখ্যা থাকব। গুয়ের ডিম ভাঙেনি আর এত বড় আকাম কর্যা বইস্যা আছে।'
রহিমা প্রথমবার সুদের উপর খাটানো লাভের টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনে। ছেলেও মাকে আশ্বাস দিয়েছিল, 'মাগে এ রাস্তায় লাভ আছে। কিসের কোরিয়া! হামি তোকে টিনের খুপরি ভেঙে দোতলা বাড়ি কইর্যা দিব।' রহিমা প্রথমে ছেলের কথা বিশ্বাস করেনি কিন্তু কয়েক দফায় যখন হাতে লাখখানেক টাকা এসে পড়ল। তখন মনে মনে রহিমা ভাবতে শুরু করে, সে দোতলা বাড়ির বেলকনিতে বসে প্রতিবেশীদের মতো সজনের শাক বাছছে। ছাদে শীতের দিন চুল শুকাচ্ছে, কাপড় মেলে দিচ্ছে। অথবা খোলা হেঁসেলে রান্না করছে।
উকিল বলে, 'ভুল স্বপ্ন দেখেছ তুমি। টাকার ব্যবস্থা করে কী করবে? খাটুক জেল, শিক্ষা হোক। কিছুদিন যাক টাকার অংকটা কমবে। বাড়ি যাও!'
৪.
এমন ঝামেলার মুখে বরিন্দ থেকে রহিমার বড় মেয়ে ফতেমা বাড়ির পোষা দুটো বতক নিয়ে এসেছে। ফতেমার উদ্দেশ্য তার মেয়ে জুবেদাকে দেখতে আসা। জুবেদার বিয়ে দিয়েছিল তারই নানি রহিমা, কাঁসারিপাড়ার মহাজনের এক পোতার সাথে। এককালে মহাজনের সম্পত্তির জেরে নামটা থেকে গেলেও দ্বিতীয় প্রজন্ম আর তা ধরে রাখতে পারেনি। নেশা আর জুয়ায় উড়িয়ে তামা তামা করে দিয়েছে। সম্পত্তির লোভে পড়ে মহাজনের বখে যাওয়া পোতার সাথে নিজের সুন্দরী লাতিনের বিয়ে দিয়েছিল সে। বিয়ের পর সংসারটা নুন ভাতেও যদি ভালো চলে তাহলে কথা ওঠে না। কিন্তু গরীবের হাড়ে বড়লোক বাড়ির মাশ লাগাতে এই বিয়ে শেষে জুলুমে পরিনত হল। ছেলেটার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, লিখাট্টু আর জুয়ারির জন্য তার বিয়েটা ভেঙে যায়। এখন জুবেদার উপর দু'দিন পর পর শারীরিক নির্যাতন চালায় সে। মেরে সাদা শরীরে লীলা ফেলে দেয়, মেয়েটা ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারে না।
ছেলেটা মোবাইলে আবার সেই আগের বউয়ের সাথে কথা বলা শুরু করেছে। ডিভোর্স হওয়ার পর যখন এরকম কার কীর্তি জুড়েছে তখন কোন সংসারী মেয়ের সহ্য হয়!
জুবেদা এই নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেই মার খায়। পাঁচ বার মার খেলে একবার ফতেমাকে ফোন করে বলে। ফতেমা রহিমাকে ফোন করে জানালে এক কথা দু কথা করতে করতে বেধে যায় ঝগড়া। গরীবের অলঙ্কার এই ঝগড়া বাতিক, তাদের কাছে এটা বড্ড অহংকারের। রহিমার কথা তার লাতিনকে মার খেয়ে থাকতে হবে, স্বামীর ঘরে মেয়েদের এরকম একটু ঘটনা ঘটে।
পাড়ায় মানুষ জানাজানি হলে বলে, 'বহু মরার সাথে বিহ্যা দিতে হয়তো বহু ছাড়ার সাথে দিতে হয়না।'
মেয়েকে দেখতে এসে মীমাংসা বেশ কয়েকবার করেছে ফতেমা, কোন ফল পাওয়া যায়নি। উল্টো জামাইয়ের কাছ থেকে জঘন্য ভাষায় প্যাশালে গালি শুনতে হয়েছে। ফতেমা সাহস পায়না আল্লাহকে দোষ দেবার, নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে মনের বিষ মনেই মেরে রেখে দেয়। হাজার হোক নারীজন্ম। বাপের ঘরে থাকলেও দোষ স্বামীর ঘরে প্রতিবাদ জনিত অশান্তি পয়দা করলেও দোষ! ফতেমা মেয়েকে রহিমার বাড়িতে ডেকে নেয়, জুবেদার আবার কোলে একটা ছেলে। ছেলেটাকে দেখিয়ে ফতেমা তার মেয়েকে স্বপ্ন দেখায় ভবিষ্যতে কিছু ভালো হবে। কিন্তু বর্তমানে অত্যাচার সহ্য করে স্বামীর ভাত খেয়ে যাও আর তিলে তিলে শেষ হয়ে যাও! এই কথাটা মুখ ফুটে না বলতে পারলেও অভিমানের সুরেই বলে সে।
ফতেমা দুটো বতক জবাই করার পর নিজেই গরম পানি করে লোম পাখা তুলে কাটতে বসে। রহিমা এশার অক্তে উঠানা দোকানে বাকিতে ময় মশলা কিনতে হাতে পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে যায়। ফতেমার মুখে আখার গনগনে আগুনের ঝালাস এসে লাগে। জুবেদাকে বলে, 'জারুয়া জামাইকে আর ভরাব! কত কিছু দিনু গরিব হয়্যাও। এসব বলতে বলতে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েকে বলে, 'তোর নানি মাগি আইলো কিনা খেয়াল করিস, নিজের মা-ই তো হামাকে জাইন্যা শুন্যাও ডুবাইলে। এত লোভিষ্ঠি মাগি তোর নানি।' জুবেদা নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ফতেমা নিজের সুরে বকে যাচ্ছে, 'এখুন থ্যাকা এখানেই যা দ্যাওয়ার দিয়্যা যাব অই জারুয়াকে মেলাই জিনিস ঢ্যালা খাওয়ালছি। আর ঢালতে জি করেনা। শেষে কিনা আইগ্ল্যা ছাড়া মাইগের সাথে পিরিত চোদাইছে। অংশ বংশ আর দেখব না জি ভইর্যা গাইল দিব, কলেজা পুড়ে খাক হয়ে গেল।' তারপর ফতেমা কাঁদতে লাগলো।
ময় মশলা কিনতে গিয়ে দোকানদারের সাথে রহিমার ক্যাঁচাল বাধে। দোকানদারের অভিযোগ রহিমা খ্যাপে খ্যাপে জিনিস কিনে নিয়ে যায় কখনো বাকিতে কখনো টাকা দিয়ে। কিন্তু দোকানদার বাকির টাকা চাইলে রহিমা টাকা দিয়ে নিয়ে যাওয়া জিনিসের দোহাই দেয়। রহিমার চোখে মুখে কথা বলা অভ্যাস। দোকানদার তো তাকে চেনে, দোকানের ভরা মানুষের মধ্যে তাকে অপমান করে জিনিস কেড়ে নেয়। এসব দেখে রহিমার চোটপাট কমে নত হয় আর আঁচল থেকে টাকা বের করে ময় মশলা নিয়ে গজর গজর করতে করতে বেরিয়ে পড়ে।
মশলার ভেতর বতকের মাংস কষতে দিয়ে ফতেমা নিজের কাছে টেনে আনে বাজারের ব্যাগ। ব্যাগ থেকে নিজের জমির আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, পেঁপে ও দুটো ডাব মেয়েকে দিল। দেওয়া শেষে ছেচকি দিয়ে মাংস কষতে কষতে হালকা আলোর মধ্যে একটা ছায়া দেখে বলল, 'মাগে তোর বেটি আইলো!' আমেনা বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বলল, 'বতক লিয়্যা আইসসিস দিদি? তুই রানছিস ভালোই হয়্যাছে মার হাতের রান্ধা বতক আইশট্যা আইশট্যা গন্ধ করে।' আমেনার আসা দেখে তার দিকে বিষ করে তাকালো রহিমা।
রাঁধতে রাঁধতে অনেক রাত হয়ে গেল। রোয়াকে সোপ পেড়ে খেতে বসে সবাই। আমেনা টিভি ছেড়ে দিয়ে খেতে বসে। বুকের হাড্ডি চিবুতে চিবুতে কেঁদে ওঠে রহিমা, না দাঁতের ব্যথায় নয় দুলালের কথা মনে করে এই কান্না!
—আহারে ব্যাটাটা হামার!
জেলের ভাত খাচ্ছে সে এখন৷ দুলালের বউ মেয়েটাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। নাজিম বিছানায় হাড্ডি চিবিয়ে খুব মনের সুরে খাচ্ছে, আমেনা এর ফাঁকে মেটে আর দানাভরা চামুচ দিয়ে হাতিয়ে নিজের পাতে নিয়ে ঝোলে মাখা ভাত দিয়ে আড়াল করে ফেলে। টিভিতে সিরিয়াল চলে। বিজ্ঞাপন শুরু না হওয়া অব্দি সবাই এঁটো হাতে বসে থাকে। কেউ ওঠে না। বিজ্ঞাপন শুরু হলে জুবেদা হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। তারপর ব্যাগের জিনিসপত্র গুছিয়ে মনের খেদে স্বামীর জন্য বাটিতে রাখা মাংস— পাড়ার একজনের ফ্রিজে রেখে, ফতেমার দেওয়া জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি চলে যায় জুবেদা।
৫.
রহিমা ছেলেকে ছাড়াবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। টাকার ধান্দা করে বেড়ায় কিন্তু কোথাও টাকার ব্যবস্থা করতে পারছে না। আমেনা প্রতিদিন ফোন পেয়ে এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে। বিয়ে লাগাতে পারলে এ যুগে বেশ লাভ। আগের মতো আর যুগ নাই যে একটা কাপড় আর দুদিন ধরে বিয়ে খাইয়েই শোধ! এখন বিয়ে লাগাতে পারলেই ছেলে মেয়ে উভয় পক্ষ থেকেই নগদ কড়কড়ে নোট ছুব দিয়ে গুনে নিবে আইবারি৷ সেই লোভে কাইয়ার মতো উড়ে উড়ে বেড়ায় আমেনা৷
একদিন তার জীবনে একটা ধাক্কা আসে সে অটোর মাইকে একটা বিজ্ঞাপনে থমকে দাঁড়ায়৷ সে শুনতে পায়, কম খরচে ঢাকা থেকে ডাক্তার আসবে চিকিৎসা দিতে। যাদের বাচ্চা হয়না, অনিয়মিত পিরিয়ড সমস্যা— প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার।
অটোওলার কাছ থেকে একটা লিফলেট নিয়ে আমেনা তার ঘরে ফিরে যায়৷ হঠাৎ আমেনা নিজেকে নিজের বয়স জিগ্যেস করে। হাতের আঙুল দিয়ে আন্দাজ লাগিয়ে বয়স কত তা হিসাব কষে। সে ভাবে কোনদিন তো বড় কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি, কিন্তু তার যে টাকাগুলো রয়েছে সেগুলো খরচ করে যদি একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায় তাহলে কেমন হবে? দোষ কী শুধু তার শরীরের নাকি দারিদ্র্যের? সে চ্যালেঞ্জ নেয়। আমেনা তার ফুলে থাকা পেটে হাত বুলায় তারপর প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে রহিমার কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর সংকল্প করে। যা করার মাকে নিয়েই করবে৷ আমেনা মনে মনে বলে , 'হামার কী আর অল দিন কেহু আছে? ভালো হইক মন্দ হইক মা তো মা-ই।'
পরদিন সকালে আমেনা তার মায়ের বাড়ি আসে। এসে অবাক হয়। দেখে তার ভাই দুলাল দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছে। মেয়েটাও বাপের সাথে দাঁতে আঙুল কচলাচ্ছে৷ আমেনা খুশি হয়ে হাসতে হাসতে গিয়ে জিগ্যেস করে, 'কখুন আলি তুই?'
দুলাল বলে, 'রাইতে!'
'তোকে ছুটাইবার ল্যাগ্যা মা কত দৌড়াদৌড়ি করলে। মা কই?' আমেনা জিগ্যেস করে। ঘরে সিরিয়াল জুড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে রহিমা৷ আমেনা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকে বলে, 'মাগে দুলালকে ছুটালি কীভাবে? টাকা পালি কুন্ঠে?' রহিমা কোন রা কাড়ে না৷ আমেনা উত্তর না পেয়ে বিছানায় বসে সিরিয়াল দেখতে শুরু করে৷ কিন্তু কী করে যে রহিমার সামনে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা তুলবে ভাবছে আমেনা৷ রহিমা হাই তুলে মেয়ের দিকে তাকায় আর তখনই আমেনা লিফলেটটা এগিয়ে দিয়ে বলে, 'মা গে ভাবছি এই ডাক্তারটার কাছে যাব। মাইকে কহছিল খুবই ভালো গাইনি ডাক্তার, ঢাকা থ্যাক্যা আসবে।'
রহিমা মেয়ের চকচকে মুখ দেখে বলল,' কি কহছিস টে বেটি, মেলাই টাকা খরচ হইবে যে। 'আমেনা ফট করে বলে, 'কেনে হামার টাকাগালা আছেনা! ওগল্যা হামি লিয়া ডাক্তারের কাছে যাব। 'রহিমা খানিক থতমত খেয়ে চোখমুখ ঘুরিয়ে বলে, 'টাকা এখান থেকে লিয়া কুনঠে উড়াইতে যাবি তুই? দরকার নাই কাছে থাকলেই লষ্ট করতে মন চাহিবে৷ আর এ বয়সে কিসের ছ্যাল্যা মারাইতে যাছিস!'
আমেনা রহিমার কথা শুনে মনটা খারাপ করে লিফলেটটা মায়ের হাতে ধরিয়ে বিছানা থেকে নামে৷ তারপর আমেনা প্রতিবারের মতো এবারও এসে তার ট্রাংকের কাছে গেলে রহিমা তাকে বাধা দেয়। বলে, 'তুই আইস্যাই এত টাকা টাকা করছিস কেনে? তোর টাকা কী কেহু খ্যায়্যা লিলে নাকি হারিয়্যা পালিয়্যা গেল? দুলালের বহু খিচোড়ি আইন্ধ্যাছে একটু খাইয়্যা লেগা!' আমেনা খাওয়ার কথা শুনে খুশি হলেও আগে ট্রাংকের কাছে যায়৷ রহিমা আর কিছু না বলে বিছানা ছেড়ে বাইরে আসে। কোমরে পায়জামার ফিতায় বান্ধা চাবি নিয়ে আমেনা ট্রাংক খুলে, লাল কাপড়ের পেট্টিটা হাতে নেয়। সেটা হাতে নিতেই তার সন্দেহ জাগে, 'আরে এত হাইল্ক্যা মনে হইছে কেনে?' সে পট্টিটা হাতে নিয়ে নেড়ে নেড়ে ওজন করে দেখে। তারপর পট্টি খুলে দেখে একটা টাকাও নাই।
—ও গে মাগে! হামার এত বড় সর্বনাশ কে করলে গে!
আমেনা পট্টিটা হাতে নিয়ে বাইরে এসে রহিমাকে উদ্দেশ্য করে বলে, 'তুই হামার টাকা লিয়্যা ব্যাটাকে ছুটালি, হায় খোদা! হামার সহায় সম্বল— আল্লা জি নিজের মা হামাকে পথে বসিয়্যা দিলে জি!'
আমেনা কাটা মুরগির মতো তড়পাচ্ছে দেখেও রহিমা, দুলাল ও দুলালের বউ কোন গুরুত্ব তো দিলই না এমনকি তার কাছে কেউ এগিয়ে পর্যন্ত গেল না। ততক্ষণে স্টিলের থালা গেলাসের শব্দ উঠেছে, ওরা সবাই সোপ পেড়ে খিচুড়ি খাওয়ার আয়োজন করতে ব্যস্ত ৷
এদিকে আমেনার দেহ যেন বিচ্ছিন্ন এক উল্কাপিণ্ড, টাকার শোক সইতে না পেরে আছড়ে পড়ে সিমেন্টের রোয়াকে। তারপর অসংখ্য যন্ত্রণার ছায়া ওর মুখে ফুটে ওঠে৷ আমেনার বিকৃত চাপা কণ্ঠস্বর তাদের টিনশেডের বাড়িটা ছাপিয়ে চারপাশের বিল্ডিংয়ে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে শব্দ তোলে, 'আ-মে-না, ম-রে-না!— আ-মে-না, ম-রে-না!'