ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)

অন্তিম পর্ব

 

সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ।

"ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি" 

এবারের মত বহু কষ্টে মায়াডোর ছিন্ন করে নতুন পথের ডাকে দিলাম সাড়া। " এবার যে যেতে হবে - " রাজপথ ত্যাগ করে অরণ্য ঘন গলি পথের আহ্বানে শোভাযাত্রা বাঁদিকে বেঁকে গেছে। সুসভ্যতার পথের ওপারে পুলকিত দলকে আজ আর থামায় কার সাধ্যি।

আপন ভোলা পাহাড়ি পথ মধুময় জঙ্গলের বুক চিরে হারিয়ে গেছে কখনো আকাশ পানে কখনো বা আরেক রহস্যময় বনানীর ফাঁকে। সরু পাথুরে আঁকাবাঁকা পথ হঠাৎ মুক্তি পেয়েছে উন্মুক্ত এক প্রান্তরে। প্রকৃতিই এখানে দ্য গ্রেট ডিরেক্টর। একে একে সবাই উপলব্ধি করছে বিরতির তাৎপর্য, কাল যাদের কপালে হয়েছিল বক্ররেখা আজ তারাই যে প্রথম সারির যাত্রী।

মৃদুমন্দ বাতাস, নির্মল রোদের মখমলী পরশ পেয়ে সকলেই শরীর এলিয়ে দিয়েছে শুকনো ঘাসের গালিচায়, এই সুযোগে হাতে হাতে ঘুরছে টুকটাক খাবার দাবার। আবার পায়ে পায়ে পথ চলা শুরু অনিন্দ্যসুন্দর বনাঞ্চল ভেদ করে যেখানে গাছের ছায়া নিয়ে করে লুকোচুরি খেলা।

সহসা এক বাঁকের পরেই দৃশ্যাান্তর, পাইন আর ওক গাছের কুয়াশায় নিভে গেছে পদচারণার চিহ্নটুকু। চর্তেনটা পার করে হাওয়ার বাঁশির সুরে তাল মিলিয়ে ছায়াময় হিমেল পথ ডানা মেলে দিয়েছে জনপদের সংস্পর্শে। সেনা পরিচালিত প্রাইমারী স্কুলের সামনেই লোহার জাল দিয়ে ঘেরা ক্রীড়াঙ্গন আর নিরাপত্তার অভেদ্য শৃঙ্খল আকারে সজ্জিত মখমলী ঝাউ বনের গভীর প্রণয় সম্মোহিত করে দেয়।

Screenshot 20260627 192202 Whats App

দেদার আরামদায়ক গড়ানে পথে গন্তব্য হাজির - ধোত্রে গ্রাম। পাহাড়ের পূর্ব ঢাল বরাবর বেশ নীচ পর্যন্ত ঝকঝকে টিনের চালের সমাগম। ট্রেকিং ট্রেইলটার শেষাংশেই শেরপা হোমস্টেকে খুঁজে পাওয়া গেল, গাড়ির দল আবার শ্রীখোলা যাওয়ার পথে আমাদের লাঞ্চ এর অর্ডার টি দিয়ে গেছে - আহা ধরে প্রাণ এল। ট্রেক তো শেষ কিন্তু ঘরে যে মন বসেনা। আহারাদির পরেই আকাশ কাঁপানো বজ্রনিনাদের সঙ্গী হল বৃষ্টি - তাতে কী! বর্ষাতি পড়েই ক'জন বেড়িয়ে পড়লাম মোমো অভিযানে।

বাকী ষোলো জনের দল এরমধ্যে শ্রীখোলাতে জাকিয়ে বসেছে, আমাদেরও তো যাওয়ার কথা ছিল - হলনা। আরে হলনা আবার কি? হওয়ালেই তো হয় - চল দেখি একখানা বাহন জোগাড় করা যায় নাকি। ধোত্রে গ্রামে আসার দৃষ্টি ভরা তাচ্ছিল্য। আমরাও কিন্তু অম্লান বদনে নিরাশাকে আলিঙ্গন করতে নারাজ। ইতিমধ্যে রিম্বিক-গামী একখানা গাড়িকে পাকড়াও করে রীতিমত কাকুতি - মিনতি করে আগাম টাকাপয়সা দিয়ে পাকাপাকি ব্যবস্থা করা গেল যে আগামীকাল এইই হবে আমাদের বাহন। " ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে / তারে আজ থামায় কে রে ..."

Screenshot 20260627 185751 Whats App

পশ্চিম-গামী সূর্যের মায়াবী আলোয় রূপ আর নির্জনতার সিন্দুকের সান্ধ্য-স্নান সত্যই উপভোগ্য। দিনমান পাততাড়ি গোটালে তমসা উড়নির সাথে ভেসে আসে ড্রিম ড্রিম ড্রাম ড্রাম ধ্বনি। শেরপা হোমস্টের মালিকের কোনো এক নিকট আত্মীয়ের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম উপলক্ষে আমাদের উপস্থিতিতে নানাপ্রকার রীতি-আচার আরম্ভ হয়েছে। রাতভর বিভিন্ন ধর্মাচারের মাধ্যমে পরলোকগত আত্মার মুক্তি সাধনের প্রথা চলছে।

বিমল অরুনালোকে আয়েসী ধোত্রের নিত্যকর্ম আরম্ভ হয়ে গেলেও রাজনন্দিনীর মানভঞ্জন হয়নি তখনও--

" তবে কি ফিরিব ম্লানমুখে সখা

হৃদয়ের আশা পুরাবে না? "

জনজটহীন ধোত্রে যখন আড়মোড়া ভাঙছে, শিশিরস্নাত পাইনের মৌতাত মন-পাখিকে উড়িয়ে দেয় কোন সুদূরে। মেঘেদের দেশে আজ কী যেন উৎসব, সবে মিলে দিগঙ্গনার নৃত্য করছে নিরবধি। ঝাউ - পাইনের বনের অমোঘ রূপে মন গুনগুনিয়ে ওঠে -

" বর্ণে - গন্ধে - ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছো দোলা...

তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা "

রঙ-বেরঙের ডেইজি, রডোডেনড্রন, পিটুনিয়া অর্কিডের কোলাজে সজ্জিত এ পাহাড় থেকে সে পাহাড়, বসত-বাড়ির আঙিনা ধরে রিম্বিক পেরিয়ে পথ গিয়েছে বেঁকে রাঙ্কামখোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। রোদ-বৃষ্টির যুগলবন্দীর রূপবৈভব, নাম - না - জানা ফুলের ম্যাফিল আর আবহে জানা অজানা পাখপাখালির ক্যাকাফোনি যেন মায়ার আস্তরণ।

এরপর বিস্ময়কর, সৌন্দর্য সিক্ত রঙিন পথ বারো জনের বাহিনীকে গড়িয়ে নিয়ে যায় শ্রীখোলার নিরালা ভূখণ্ডে, যেখানে আকাশ ছুঁয়েছে নদীকে। ঈশ্বরের এই নির্মল বাগিচায় প্রতিটি কোণায় খুঁজে ফিরি আমার " আমি " কে। প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য স্নাত ছোট্ট নদীকেন্দ্রিক অনাঘ্রাত জনবসতি শ্রীখোলা। যতদূর চোখ যায় আকাশচুম্বী পাইন - ফার এর ঘন জঙ্গল, পাহাড় গাত্রে গাঢ় সবুজ ফার্নের ওড়নার বহর জুড়ে নানা রঙের প্যাচওয়ার্ক। পাখিদের কলকাকলি, রঙচঙে পতাকার চঞ্চলতা আর ঠাসবুনোট পাইনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া আর জলধারার মিশ্র সিম্ফনি নেশায় বুঁদ করে দেয়।

নির্জন টলমল জলভরা স্রোতস্বিনী বয়ে চলেছে নিরবধি, " নদী আপন বেগে পাগলপারা "। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলিয়ে নদী ছুটে চলেছে ধূসর মেঘলোকে।

" আমি বসে বসে তাই ভাবি

নদী কোথা হতে এল নাবি "

মেঘ থই থই পাহাড়ী বসতি, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই সবুজ চলতে পড়ছে, আর সেই ঘন বনের বুক চিরে বয়ে চলা শ্রীখোলা নদীর শরীর জুড়ে পঞ্চদশীর প্রাণোচ্ছলতা, নবযৌবনের উন্মেষে গর্বিতা।

Screenshot 20260627 185425 Whats App

পাঁচরঙা পতাকা সজ্জিতা ঝুলন্ত কাঠের সেতু উত্তাল তরঙ্গিনী পারাপারের উপায়। সেতুটার সাথে আমার সখ্যতা পূর্বের - তাই কিছুটা একাকী সময় তো মানবঞ্জনের জন্য বরাদ্দ থেকেই যায়। নদীর মন্দ্রমুখর তরঙ্গ আর পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে ফিরে আসা শনশন হাওয়ার প্রতিধ্বনি মাতোয়ারা করে দেয় মেঘের চাদরে মোড়া অমরাবতীকে।

দুইদল আজ আবার মিলিত হয়েছে ধোত্রের বাড়িতে। সরব জমায়েতের মাঝে কালচে মেঘের ঘনঘটা, তার ব্যাকুলতা ঝরতে থাকে অমর ধারে। দূর পাহাড়ে মানব বসতির নিয়ন আলোকচিহ্ন ফ্যাকাশে হয়ে ধরা দিয়েছে মনের মোড়কে।

মেঘবালিকাদের তান্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করতে করতে সবুজভ আকে কিন্তু ঘোলাটে নিরালা ভূখন্ড ছেড়ে আমরা চলি ফিরতি পথে। পাহাড়ের গা জড়ানো সর্পিল কালো উড়নির মোহিনী রূপ সমতলের দিকে হাতছানি দেয়। তরঙ্গায়িত চা-জগৎ এর বুক চিরে তুফান গতিতে এগিয়ে চলেছি, সভ্যতার প্রতি এই আকর্ষণের হেতু কি মহাকর্ষ? মনের প্রশ্নকে মনেই সমাধিস্থ করি বটে তবে হৃদয় আকাশে ঘনায় মেঘের ছায়া।

" তবে এবার বিদায় সখা আবার হবে যে দেখা

লিখব তোমায় অনেক চিঠি

 পাঠিয়ে দেব মেঘের দ্বারা "

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
সুরজিৎ ব্যানার্জি

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)

কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

সাপ্তাহিক লেখালেখি১৩ জুন, ২০২৬
অর্ঘ্য রায় চৌধুরীর দুটি কবিতা
অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

অর্ঘ্য রায় চৌধুরীর দুটি কবিতা

সমস্ত উৎসব ফুরিয়ে গেছে বলেই সন্ধ্যা নেমে এল মেঠো পথ, বহুদূরে গাছেদের সারি বিকেলের আলোটুকু ম্লান এখন কোথায় যেতে পারো তুমি? অন্ধকারে হাতড়ে বেরিয়েছো চেনা পথ পুরোনো দরজায় কড়া নেড়ে দেখেছো বন্ধ হয়ে গেছে সমস্ত চিঠিদের চোখ এখন এক চোরাবালি জেগে উঠেছে ধূ ধূ চর, ওইপারে নিঃঝুম গ্রাম এইখান থেকে আজ ফিরে যেতে পারো।

সাপ্তাহিক লেখালেখি৬ জুন, ২০২৬
ব্রাত্য ঈশ্বর ও সৃষ্টির সংলাপ
এম এ ওয়াহিদ

ব্রাত্য ঈশ্বর ও সৃষ্টির সংলাপ

মানুষ শূন্য পৃথিবীর পায়ুপথে একটা আপেল গাছ রোপন করার পর আমি সোজা হাঁটা ধরলাম নরকের দিকে। পথে দেখা হলো ক্রশবিদ্ধ যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে। পথে দেখা হলো নূহের পুত্র কেনানে'র সঙ্গে। প্রত্যেকে তাঁদের নিজের পিতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

সাপ্তাহিক লেখালেখি৪ জুলাই, ২০২৬