
।প্রথম পর্ব/
জল গড়িয়ে পড়ছে নরম গাল বেয়ে,
ছলাৎ ছলাৎ পাড় ভাঙার একটানা লয়
বর্ষার উচ্ছ্বল নদীর গর্জনে মিশে যাচ্ছে ;
কাজল কালো আসমানী চোখ বেয়ে শ্রাবণধারায় বুক ভিজছে ।
তৃষার খেয়াল নেই কখন আকাশের পশ্চিম কোণ কালো হয়ে গেছে ।
আখরিগঞ্জ এর ছোট্ট বাজার,সপ্তাহে দু দিন হাট বসে, মঙ্গল ও শুক্রবার।হাটবারেই বাজার জমে ওঠে বেশী।আসে পাশের অনেক ছোট ছোট গ্রামের এটাই কাছাকাছি গঞ্জের হাট ।বাজার এর পশ্চিম দিকে খেয়াঘাট । বাজার ছাড়িয়ে সোজা সড়ক পথে আধ ঘন্টা গেলে লালমোহন কলেজ। তৃষা বাংলা অনার্স এর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তাদের গ্রামে একটি মাত্র স্কুল লাল বাতির মত টিমটিম করে জ্বলছে তাও ক্লাস এইট পর্যন্ত। পদ্মার ভাঙন সব গ্রাস করছে প্রতিবছর।তাদের ছোট গ্রামখানি প্রধানত কৃষি নির্ভর ,সেও খুব কম পরিমাণ, বাকিরা দিনমজুর বা মাছের কারবারে যুক্ত, আর হাতে গোনা কয়েকজন চাকরী করে। তৃষা অনেক জেদ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে , অনেক কষ্ট করে এতদূর এসে স্কুল তারপর কলেজের গন্ডিতে পা রেখেছে। বাবা পদ্মায় মাছ ধরে যেটুকু আয় করে তাতে বাপ মেয়ের কোনোরকমে চলে যায় কিন্তু কলেজে পড়ার সিদ্ধান্তটা তার নিজের অদম্য ইচ্ছের দরুণ সম্ভব হয়েছে নয়তো তার বয়সী গ্রামের প্রায় সব মেয়েরই বিয়ের পিঁড়িতে বসার বয়স হয়ে যায়।তৃষার বাবার প্রথম দিকে একটু আপত্তি থাকলেও পরে আর কোনো বাঁধা দেয়নি। আসলে মা মরা একটি মাত্র আদরের মেয়ের পড়াশোনার প্রতি প্রবল অনুরাগ দেখে অভাবের সংসারের নানা জটিলতার মধ্যেও সে যথাযথ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।
তৃষার চোখ লাল হয়ে গেছে , টানা টানা দীঘল চোখদুটির দিকে তাকালে সহজে চোখ ফেরানো যায়না । খেয়াঘাটের একপাশে দাঁড়িয়ে একজন তার অলক্ষ্যে তাকিয়েছিলো এতক্ষণ, একদৃষ্টে লক্ষ্য করছিলো তাকে। তৃষা মুখ নীচু করে ভাবছিলো কি করবে হঠাৎ মুখ তুলতেই দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। সুপুরুষ বলতে যা বোঝায় তা না হলেও বেশ দেখতে, চোখ নাক কাটা কাটা, মাঝারি হাইট, গায়ের রঙ একটু চাপা হলেও চোখের মণি দুটো হালকা খয়েরী রঙা। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন যুবক। তৃষা অপ্রস্তুত, তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেললো তারপর দ্রুত নৌকোয় গিয়ে বসে পড়লো। নৌকোর অন্য প্রান্তে ছেলেটি বসলো। নৌকো চলতে শুরু করলো।
তৃষার নিজস্ব ভাবনায় ছেদ পড়েছে অনেকক্ষণ আগেই, এভাবে ঘাটের ধারে অশ্বথ গাছের নীচে বসে নীরবে একটা মেয়েকে কাঁদতে দেখে কি জানি ছেলেটা তার সম্পর্কে কি ভাবছে। নতুন মুখ, পোশাক - আশাক দেখেও তো এদিকের কোনো গ্রামের ছেলে বলে মনে হচ্ছে না। কোনো শহরের ছেলে বলেই মনে হচ্ছে, ডেনিম জিন্স আর কালো রঙের টি শার্ট পড়েছে ছেলেটি। ছেলেটি এখনো তার দিকেই এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে, তৃষা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। মেঘের ফাঁক গলে গোধূলির একফালি সোনালী নরম আলো তৃষার উজ্জ্বল গম রঙা গায়ে পিছলে যাচ্ছে, যেন তরল সোনা গলে পড়ছে পদ্মার জলে।
বেলা পরে এসেছে তাই নৌকায় লোকজন কম,হাট বার হলে বেশি হয় , একটি অল্প বয়সী ছেলে পাড় দিয়ে নৌকায় গুন টানছে।এই ভরা শ্রাবণে পদ্মা রানী মত্ত হস্তিনীর ন্যায় ক্ষেপে ওঠে,এই সময় গুন টানা ছাড়া উপায় থাকেনা। নৌকা দুলছে টলমল। তৃষা দূর আকাশের ঘন কালো মেঘের দিকে তাকায়, প্রচন্ড বৃষ্টির পূর্বাভাস স্পষ্ট। গ্রামের ঘাট থেকে প্রায় দু কিলোমিটার হাঁটা পথ পেরিয়ে তাদের ছোটো কাঁচা বাড়ি। বড্ড দেরী করে ফেলেছে আজ , নিজের মনে নিজেকেই দোষারোপ করে কিন্তু সেই বা কি করবে! দু মাসের কলেজের ফি বাকি এই নিয়ে কথা বলতে প্রিন্সিপাল স্যার তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। খুব বাজে ব্যবহার করলেন, বাংলার জীবন স্যার এর সামনেই বললেন এমাসের মধ্যে ফি জমা না দিলে পরীক্ষায় বসতে দেবেন না। এখন সে কি করবে!হঠাৎ মেঘের গর্জন আকাশ কাঁপিয়ে পদ্মার বুকে চমকে উঠলো।তৃষা ঘাড় ঘোরাতেই ছেলেটির দিকে নজর পড়লো, সে এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে, আঁধার ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। তাদের গ্রামের ঘাটে পৌঁছতে আর প্রায় আধ ঘন্টা খানেক লাগবে।আকাশের দিকে চাইতেই মুখ শুকিয়ে গেল, ভারী ঠান্ডা হাওয়ায় তৃষার রেশম লম্বা চুল উড়ছে, আর্দ্র বাতাসে শরীর কেঁপে ওঠে।
- পরাণ দা একটু তাড়াতাড়ি টানতে বলো না !
- ইর থেকিই জোরে টানা যাবি নাগোও বুন, বাতাস দিছে গোওও ।তা বুন আজ আত্তো দেরী করলা ক্যান ?বাদলার দিন তার উপর ইদিকপানে বিদ্যুৎ বাতি লাই আর দিনকাল যা পড়সে তাতে তুমি ঠিক করোলাই বুন ।
তৃষা চুপ করে থাকে , এসব কথা যে তারও মনে আসেনি তা নয় ।কিছুদিন আগে সুতপা কাওকে কিছু না বলে উধাও হয়ে গেলো ।অনেক খোঁজ খবর করা হল , পুলিশ এলো কিন্তু কোনো কিছুই হলোনা।কেউ কেউ বললো কারো সাথে পালিয়েছে কিন্তু ওইটুকু গ্রামের খবর চাপা থাকেনা ,প্রাইমারি তে একসাথে পড়েছে ।সুতপা খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ,এমন করতেই পারে না । কেউ মুখ না খুলুক তবু একটা চাপা খবর চাউর আছে ।তাদের গ্রামের পর বিশাল পদ্মার চর বিস্তৃত ,তারপর কাঁটাতারের ওপারে বাংলাদেশ ।মুর্শিদাবাদ জেলার ভারত আর বাংলাদেশ এর বর্ডার এলাকায় গরু আর মেয়ে পাচারকারীরা অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকে , সুযোগ পেলেই কাজ হাসিল করে ।এ তল্লাটে পুলিশ প্রশাসন সব জানে কিন্তু তারা টাকা খেয়ে চুপ করে থাকে। ভয় দানা বাঁধতে থাকে মনের কোণে । ওই ভিনদেশী ছেলেটার দিকে চোখ যায় ,অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যায়না শুধুমাত্র কালো অবয়ব ঠাওর হয়।
পরবর্তী পর্ব অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্ব আগামী শনিবার (০১/০৮/২০২৬) প্রকাশিত হবে।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ভিনদেশী তারা (পর্ব-২)
ঘাটে যখন নৌকা পৌঁছলো তখন সন্ধ্যে ৬টা বেজে গেছে ! চারিদিকে অন্ধকার , বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো অনেক আগে কিন্তু এখন বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"