
||দ্বিতীয় পর্ব||
ঘাটে যখন নৌকা পৌঁছলো তখন সন্ধ্যে ৬টা বেজে গেছে ! চারিদিকে অন্ধকার , বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো অনেক আগে কিন্তু এখন বেগ বাড়তে শুরু করেছে।
সেই ভিনদেশী যুবক তার সাথেই নৌকো থেকে নামলো , আর কেউ নেই ,তারাই দুজন শেষ যাত্রী।নৌকোর মাঝি পাশের গাঁয়ের লোক সুতরাং সে নৌকা নিয়ে ফিরে গেলো। প্রচন্ড মেঘ গর্জন আর বিদ্যুতের তীব্ৰ আলো আকাশ চিরে পদ্মার বুকে আঘাত করছে , মুষলধারে বৃষ্টি নামলো।
তৃষা গ্রামের মেয়ে হলেও দীর্ঘ দিন ধরে এ পথে গঞ্জে যাতায়াত করছে, লেখাপড়া শিখেছে তাই আর পাঁচটা গ্রাম্য মেয়ের মত ভীতু বা আনস্মার্ট নয় তবুও এখন তার খুব ভয় করতে লাগলো । ঘাটের ধারে একটি বড় বট গাছের দিকে ছেলেটি এগিয়ে যাচ্ছে, সে আর দাঁড়াতে চাইলো না , বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটা দেবে। একটু এগোতেই পেছন থেকে ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়ালো , তৃষা কি করবে বুঝে ওঠার আগেই সে নরম গলায় বললো ....
- আমাকে এই বৃষ্টির মধ্যে একলা ফেলে চলে যাচ্ছেন ? খুব স্বার্থপর তো আপনি !
সে কি বলবে ভেবে পেলোনা , ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ কিন্তু ছেলেটির গলার আওয়াজে এমন কিছু ছিলো যাতে সে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকলো ।
আমি ধ্রুব সেন। এখানে প্রাইমারি স্কুলের হেড স্যারের বাড়ি যাব। কাইন্ডলি আমাকে একটু সাহায্য করবেন? কি হল কিছু বলুন , প্লিজ ভয় পাবেন না , আমি আপনার সাহায্যপ্রার্থী।
বিদ্যুৎ এর আলোয় এক পলকের জন্য চারিদিক আলোয় ভাসলো ,তৃষা সম্বিৎ ফিরে পেলো ।
-এই সোজা দেড় কিলোমিটার পথ গিয়ে বাম দিকে স্কুলের পাশের রাস্তা ধরে কিছুটা গেলেই হেড স্যারের বাড়ি ।কাউকে জিজ্ঞেস করলে দেখিয়ে দেবে ।
- আপনার বাড়ি কি এদিকেই ?
- হ্যাঁ
-ইস পুরো ভিজে গেছেন, আসুন ওই গাছের নীচে দাঁড়াই , বৃষ্টি একটু ধরলে একসাথেই যাওয়া যাবে।ভয় নেই আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না ।ভরসা রাখতে পারেন ।
তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো কি উত্তর দেবে ভেবে পেলোনা। বৃষ্টির বেগ আরো বেড়ে গেলো এবং পাল্লা দিয়ে মেঘ গর্জন।অগত্যা নিরুপায় হয়ে দুজনে গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ালো।
- আপনার নাম জানতে পারি ?
-তৃষা
- বাহ, ভারি মিষ্টি নাম ।
তৃষা নামটা তার মা রেখেছিলো।এমন সৌখিন নাম গ্রামের সাধারণ গরীব ঘরের মেয়েদের রাখা হয়না কিন্তু তার মা এইট পাস ছিল এবং গল্প পড়তে ভালোবাসতো । কোনো এক গল্পের নায়িকার নাম ছিল তৃষা, নামটা মায়ের খুব পছন্দ হয়েছিলো। এসব মা মারা যাওয়ার পর বাবার মুখে শুনেছে। পাঁচ বছর বয়সেই ডেঙ্গু জ্বরে মা কে হারায়। এ গাঁয়ে তো সেরকম ডাক্তার নেই ভরসা কেবল গঞ্জের হাসপাতাল।
এই বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় তৃষার সাথে এই গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরে ধ্রুবর বেশ ভালো লাগছে , প্রথম দেখাতেই তৃষাকে ভালো লেগেছে।মিষ্টি দেখতে । নীল রঙের চুড়িদার ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে । ধ্রুব মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো।সে অনাথ, ছোটবেলায় বাবা ,মা মারা যাওয়ার পর জেঠু ,কাকাদের কাছে মানুষ হয়েছে।তারপর কলেজ পাশ করার পর চাকরী।তার জীবনে ভালোবাসার অভাব থেকে গেছে ,কলেজ জীবনে কাউকে ভালো লাগলেও বলা হয়নি কারণ জীবনের কঠিন লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।দুজনেই চুপ করে ছিলো অনেকক্ষণ ,নিজেদের ভাবনায় ডুবে ছিলো।তৃষার কৌতুহল বাড়ছিলো ধ্রুব কে নিয়ে তারপর জিজ্ঞাসা করলো...
- তা আপনি এই অজ পারাগাঁয়ে কি ব্যাপার বলুন তো ? আপনাকে আগে কখনো এদিকে দেখিনি !
- হ্যাঁ , ক্ষানিকটা আশ্চর্য্যের ব্যাপার বটে ! আমি হেড স্যারের কাছে একটি বিশেষ কাজে এসেছি!
- ওহ , তা কি কাজ জানতে পারি ?
- নিশ্চয় পারেন , চলুন বৃষ্টি একটু কমেছে , যেতে যেতে কথা হবে।
এগোতে যাবে অমনি পা পিছলে গেলো ,এক ঝটকায় ধ্রুব তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো।পুরুষের শক্ত হাত তার নরম হাতের মধ্যে চেপে বসলো ধ্রুবর আর একটি হাত তার কোমরের কাছে ।ঘটনার আকস্মিকতায় দুজনেই হতভম্ব, তৃষার লজ্জায় রাঙা মুখখানি বিদ্যুতের আলোয় ধ্রুবর চোখ এড়ালো না।
এই প্রথম কোনো পুরুষ এভাবে তাকে স্পর্শ করলো ,বুকে দামামা বাজছে , সারা শরীর বেয়ে বিদ্যুৎ নেমে গেলো যেন।
-কি হলো চলুন!ধ্রুব ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক করতে চাইলো।
দুজনে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলো।
তৃতীয় পর্ব আগামী শনিবার (০৮/০৮/২০২৬) প্রকাশিত হবে
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

ভিনদেশী তারা পর্ব-৩
পদ্মার বুকে জেলে মাঝিদের নৌকোগুলো দুলছে ,টিমটিম বিন্দু বিন্দু নৌকোর আলোগুলি গুঁড়ো বৃষ্টি আর ঠান্ডা হওয়ায় দোদুল্যমান।এই সময় রূপোলি মাছ পদ্মার বুকে চলে ফিরে বেড়ায়, সারা বছর জেলে মাঝিরা এই ইলিশ এর মরসুমের জন্য মুখিয়ে থাকে।গাঢ় আঁশটে গন্ধ বাতাসময়। দুজনে বালির চরের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে ,অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে ।

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"