
//পঞ্চম পর্ব//
ধ্রুব দরজার সামনে গিয়ে দেখলো ও. সি. চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বুকের উপর হাত দুটো জড়ো করে বসে প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন।ধ্রুব আশ্চর্য হলনা মোটেও সে বিরক্ত হল খানিকটা কারণএই মফস্বল শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অনৈতিক কাজকর্ম ঘটে চলেছে আর এদের কোনো হেলদোল নেই ।ধ্রুব দরজায় টোকা দিলো।
-ভেতরে আসতে পারি ?
ভদ্রলোক ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন , ধ্রুবর দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন।যেন সে ভিনগ্রহ থেকে এই অসময়ে তার নিদ্রা ভঙ্গ করতে চলে এসেছে ।
-ওহঃ, মিষ্টার সেন !
আসুন বসুন।
- কিছু খবর আছে ?
-হুম, আছে। ওদের দলটাকে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছি ।আপনি যা করার করেছেন এবার আমাদের উপর ছেড়ে দিন , খবরের কাগজের লোক এইকদিন ধরে মাথা খারাপ করে দিয়েছে ।আপনাদের আর কি ,ঠেলা সামলাতে হয় আমাদের । এদিকে একলা ঘোরাফেরা করবেন না , বিশাল নদীর মুখে বর্ডার এলাকা , বিপদ চারদিকে ।কখন কি হয় বলা মুশকিল।
-আপনি এখন এখানে কোথায় থাকবেন ?
-এদিকে একজন পরিচিতের বাড়ি।
-ওহঃ, ঠিক আছে , আশাকরি খুব তাড়াতাড়ি দলটাকে ধরতে পারবো।
-মিসিং মেয়েগুলোর কোনো খবর পেলেন?ওদের কি বাংলাদেশ এ পাচার করে দেওয়া হয়েছে?
-দেখুন মিষ্টার সেন , এসব ক্ষেত্রে মেয়েগুলোকে উদ্ধার করেও কি কিছু লাভ আছে ? এই গ্রামের মানুষগুলো ওদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে নেবেনা।ওরা ইন্ডিয়াতে নেই সম্ভবতঃ, সেরকমই খবর আছে ।
-সমাজ না মেনে নিক তবুও তো ওরা মানুষ।আমাদের অর্গানাইজেশন ওদের জন্য ব্যাবস্থা করবে ।
- সেরকম খবর পেলে ওদের ফিরিয়ে আনার ব্যাবস্থা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হবে।
-ঠিক আছে স্যার, অনেক ধন্যবাদ।
থানা থেকে বেড়িয়ে সোজা খেয়াঘাটে।জেলে নৌকা কয়েকটা সার বেধেঁ ঢেউ এর ধাক্কায় দুলছে। সবে সাড়ে সাতটা বাজে ।এর মধ্যেই ঘাট শুনশান।শহরের মধ্যে লোকজনের ভীড় আছে , দোকান পাট খোলা আছে কিন্তু ঘাটের খেয়া বন্ধ হয়ে যায় । শেষ খেয়া সাড়ে ছটায়।অগত্যা জেলে মাঝির নৌকা জোগাড় করতে হবে। ঘাট এর ডান পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে কিছুটা গেলেই জেলে বস্তি ।আগেরবার দেখেছিল। সেখানে গিয়ে একজন মাঝিকে রাজি করালো অতি কষ্টে । আটটা নাগাদ রওনা দিলো দুজনে।
অপূর্ব মায়াবী রাত নদীবক্ষে জলছবির রূপোলি ক্যানভাস।শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ পূর্ণ হতে দু দিন বাকি তবুও বেশ জ্যোৎস্নায় ভাসছে চরাচর। টুকরো টুকরো মেঘ চাঁদের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, এই আলো ছায়ার লুকোচুরি , মেঘের ফাঁক গলে সোনালী নরম আলো যেন মায়াময় ,যেন অপার্থিব আলেয়ায় পৃথিবীর ঘুমন্ত চর জেগে উঠছে ধীরে ধীরে ।এমন রোমাঞ্চকর রাত আগে কখনো দেখেনি ধ্রুব ।অদ্ভুত ভালোলাগায় ডুবে গেল মন । দূরে জেলেদের নৌকো গুলো জাল ফেলেছে , বিন্দু বিন্দু আলো গুলো দুলছে ।ঠান্ডা জোলো হাওয়া শরীরের মজ্জায় গিয়ে মিশছে , বেশ লাগছে ,কিছুটা ক্লান্তি দূর হলো যেন,আরামে চোখ বুজে ফেললো ধ্রুব।
-আপনি এত দেরি করলেন কেন আসতে?আপনি কি জানেন না যে আমি অপেক্ষা করে আছি।
নদীর তরঙ্গের মত ভেসে এলো কথাগুলো। ধ্রুব ঘাড় ঘোরাতেই দেখতে পেলো তৃষাকে ।কি মিষ্টি স্মিত হাসি। হাসলে তৃষার বাম গালে টোল পড়ে।
ঘন নীল শাড়িতে তৃষার শরীর আকাশ , জ্যোৎস্নার আলোয় জরির পাড়ে একটি দুটি তারা ফুটছে ।
-তুমি অপেক্ষায় ছিলে?কেন তৃষা?
-কেন মানে !আপনি কি কিছুই জানেন না , বোঝেননা?
-বলো , বুঝতে চাই , জানতে চাই ।বলো কেন অপেক্ষা করে ছিলে?
-বাহ রে ,আপনিই তো বলেছিলেন অপেক্ষা করতে। আপনার কিছুই মনে থাকেনা ।
অমন করে কি দেখছেন ?
-তোমাকে তৃষা, শুধুমাত্র তোমাকে দেখতে চাই সারাজীবন ।
-তাই বুঝি , তৃষার হাসি জলতরঙ্গের মত বেজে উঠলো হৃদয়ে।
-তবে আমি যাই।
-কোথায় যাচ্ছো, তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না , তৃষা দাঁড়াও যেওনা ...........
বাবু ,ও বাবু ওঠেন ।অমন করতাছেন ক্যান?কারে ডাকতাছেন?ঘাট আইসা পড়সে।ও বাবু......
জেলে মাঝির ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো ধ্রুব।ঠান্ডা হওয়ায় আর ক্লান্তিতে চোখ লেগে গিয়েছিল।ধ্রুবর সামনে মাঝির মুখ ,তাহলে সে সব স্বপ্ন দেখছিলো , ধ্রুব ভাড়া মিটিয়ে নৌকো থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলো ।যখন স্যারের বাড়ি পৌঁছলো তখন রাত সাড়ে দশটা ।
পরদিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খেয়েই বেড়িয়ে পড়লো তৃষার বাড়ির উদ্দেশ্যে।আজ রবিবার। তৃষা আজ নিশ্চয় বাড়িতেই থাকবে।তার মনটা অদ্ভুত এক আনন্দ ও টেনশন এর মিশেলে পাক খেতে শুরু করলো।কি বলবে কিভাবে শুরু করবে সে কিছুই ভাবেনি ,ভেবে কি ভালোবাসা আদৌ হয় তার জানা নেই। সে তৃষাকে ভালোবেসে ফেলেছে মাত্র একবার দেখে ,এ কি সম্ভব !এত প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই ।তৃষাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে , এত অস্থিরতা কেন তার মনে সে কিছুতেই কোনো সদুত্তর পেলোনা ।শুধু সে এটুকুই বুঝতে পারলো যে তৃষার সাথে কথা বলার জন্য ,তাকে একটু দেখার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে ।একজন কে জিজ্ঞাসা করতেই বাড়িটা দেখিয়ে দিলো। সামনেটা খোলা উঠোন , তারপর টিনের চালের কাঁচা বাড়ি , দুটো মাত্র ঘর । উঠোনের একপাশে ছোট রান্নাঘর ।কাউকেই দেখতে পেলোনা ,ডাকবে কিনা ভাবছে ,এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো ...
-আপনি !
কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পড়েছে তৃষা। খোলা চুল এলোমেলো ,আটপৌরে সাজে একটা আলগা লাবণ্য ফুটে উঠেছে তৃষার মুখময়।তৃষার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলো না ধ্রুব।
তৃষা কিছুক্ষণ যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। কোথায় বসতে দেবে কি বলবে ভেবে পেলোনা , দাঁড়িয়ে রইলো হাতের কলমি শাক গুলো নিয়ে ।মৌনতা ভেঙে কথা বললো ধ্রুব।
-বসতে বলবেন না ?
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো ,সত্যি তো এতদূর থেকে তার বাড়িতে একজন অতিথি এসেছেন অথচ সে একবারও বসতে বলেনি, হাতের শাক গুলো রান্নাঘরে তাড়াতাড়ি রেখে এসে মাটির দাওয়ায় একটা মাদুর পেতে দিলো ।
-বসুন।
ধ্রুব বসে পড়লো ।কিভাবে যে কথাটা বলবে ভেবে পাচ্ছেনা ।তৃষা তাকে যদি খারাপ ছেলে ভেবে নেয় , হাতের প্যাকেটের দিকে তাকালো।কলেজে অনেক বান্ধবীদের সাথে কথা বলেছে ,কখনোই জড়তা অনুভূত হয়নি কিন্তু এখন দুম করে দ্বিতীয় আলাপে একটি মেয়েকে এরকম উপহার দেওয়ার কথা বলতে সঙ্কোচবোধ হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক, তারমত এমন আহাম্মকের কাজ মনে হয় কেউ করেনি ।
তৃষা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। সে কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেনা তার কাছে ধ্রুবর আসার কিন্তু কথাটা মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতেও পারছেনা ,ধ্রুবর হাতের প্যাকেটটার দিকে নজর পড়লো , কৌতূহল বাড়ছে তৃষার মনে।
-একগ্লাস জল খাওয়াবেন?
-হ্যাঁ নিশ্চয়!
তৃষা রান্নাঘর থেকে দ্রুত একগ্লাস জল নিয়ে এসে ধ্রুব কে দিলো।
ধ্রুব এক নিঃশ্বাসে জলটুকু শেষ করলো।তৃষার দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসলো ,গলার কাছে শব্দগুলো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই ভাষা খুঁজে পেলোনা ধ্রুব । ফোনটা মুঠোর মধ্যে আড়ষ্ট ,ধ্রুবর নিজেকে ভীষন বোকা বোকা লাগছিলো।ধ্রুবর হঠাৎ মনে হল কাজটা তার ঠিক হচ্ছেনা,এভাবে ফোনটা তৃষাকে দেওয়া ঠিক হচ্ছেনা কারণ তৃষাকে নিজের অজান্তেই আবেগের বশে অপমান করতে যাচ্ছিলো।সেটা করার কোনো অধিকার তার নেই । কি বলবে এখন সে ,আর এভাবে কিছু না বলে চুপচাপ বসেও থাকা যায়না । উঠে পড়লো ধ্রুব।
-কিছু কাজে এসেছিলাম ,ভাবলাম একবার দেখা করে যাই।
কোনোরকমে কথাগুলো বলতে পারলো ।তারপর কিছু টুকটাক কথা বলেই উঠানের দিকে পা বাড়ালো ধ্রুব।আর কথা বলতে পারছেনা সহজভাবে।
-আজ আসি তাহলে।
-আপনি কি আজই চলে যাবেন ?
-না ,কাল যাব।
-কাল কখন যাবেন ?
-দেখি কাজ কখন শেষ হয় ।কেন বলুন তো ?
- আসলে কাল শ্রাবণী পূর্ণিমা তে পাশের গ্রামের নদীর চরে মেলা বসবে।আগে অনেক বড় মেলা বসতো এখন ছোটো করে বসে। গেলে গ্রামীন মেলার রূপ দেখতে পেতেন। আমি যাই প্রতিবছর , আসলে অনেক পুরোনো ওই শিব মন্দির যা এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে ।খুব জাগ্রত এই মহাদেব।থাকলে একবার ঘুরে যেতে পারেন।
-ঠিক আছে ,থাকতে পারলে নিশ্চয় যাবো।
ধ্রুবর বলতে ইচ্ছে করলো তোমার সাথে যেতে চাই তৃষা , তোমার সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করে , তাই জন্যই ফোনটা এনেছি ।
অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখে পড়ে ধ্রুবর চোখে মুখে অস্থিরতা ধরা পড়লো ,তৃষার নজর এড়ালো না।তৃষা বুঝতে পারলো ধ্রুব অন্য কিছু বলতে এসেছিলো কিন্তু সেটা কি তা অনুমান করতে পারলো না।ধ্রুব আর দাঁড়ালো না দ্রুত বেরিয়ে গেল।শূন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তৃষার মনে এক পলকের জন্য একটা প্রশ্ন উঁকি দিলেও পরক্ষণে সে নিজেকে বোঝাতে চাইলো এর উত্তর পেতে চাওয়া তার কাছে আকাশের চাঁদকে কাছে পেতে চাওয়া।
পরবর্তী অর্থাৎ অন্তিম পর্ব আগামী ২৯/০৮/২৬(শনিবার) প্রকাশিত হবে।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ভিনদেশী তারা (পর্ব-২)
ঘাটে যখন নৌকা পৌঁছলো তখন সন্ধ্যে ৬টা বেজে গেছে ! চারিদিকে অন্ধকার , বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো অনেক আগে কিন্তু এখন বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"