ভিনদেশী তারা পর্ব-৩
ভিনদেশী তারা পর্ব-৩

||তৃতীয় পর্ব||

পদ্মার বুকে জেলে মাঝিদের নৌকোগুলো দুলছে ,টিমটিম বিন্দু বিন্দু নৌকোর আলোগুলি গুঁড়ো বৃষ্টি আর ঠান্ডা হওয়ায় দোদুল্যমান।এই সময় রূপোলি মাছ পদ্মার বুকে চলে ফিরে বেড়ায়, সারা বছর জেলে মাঝিরা এই ইলিশ এর মরসুমের জন্য মুখিয়ে থাকে।গাঢ় আঁশটে গন্ধ বাতাসময়। দুজনে বালির চরের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে ,অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে ।

তৃষা চুপচাপ হাঁটছিলো।

-আমি বহরমপুরে একটি সরকারী ব্যাংকে চাকরী করি এবং একটি এন .জি. ও . এর সাথে কাজ করি।এন. জি . ও . এর একটি কাজে স্যারের সাথে কথা বলতে এসেছি । আমাদের এন. জি.ও. তে উনিও কাজ করেন ।

ধ্রুব এর বেশীকিছু এখনই বলতে চাইলো না তৃষাকে ।আসলে তাদের অর্গানাইজেশন প্রধানত পীড়িত নারী ও শিশুদের উদ্ধার কার্যের সঙ্গে যুক্ত।ইদানিং এ অঞ্চলে নারী পাচার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে । প্রশাসকদের সাথে তাদের আঞ্চলিক প্রধানের কথা হয়েছে । ম্যাডাম তার কাঁধে এই দায়িত্ব দিয়েছেন । এইসকল মেয়েদের পুনরুদ্ধার করা যদি সম্ভব হয় বা এই চক্রের পান্ডা পুলিশের হাতে ধরা পরে সেই ব্যবস্থা করা যায়। কেন্দ্রীয় প্রশাসক এর সাথেও ম্যাডাম এ ব্যাপারে কথা বলেছেন ।এদিকের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের অফিসার এর সাথে কথা বলতে সে এসেছে , সাথে হেড স্যার ও যাবেন । দেখা যাক কি হয় , এসব ধ্রুব এর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো।চিন্তাগুলো আপাতত সরিয়ে তৃষার বাবা কি করে ,এখন সে কি করছে এসব টুকিটাকি প্রশ্ন করছিলো। তৃষা সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো। ধ্রুব হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো আপনি কাঁদছিলেন কেন ?

তৃষা লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো, এ প্রশ্নের কি উত্তর দেবে ভেবে পেলোনা । চুপ করে থাকলো। অভাবের কথা একজন অপরিচিত ব্যক্তির সামনে কিভাবে বলবে । ধ্রুব বুঝতে পারলো তৃষা কারণটা তাকে বলতে চায়না , সে আর জোর করলো না , অন্য প্রসঙ্গ টানলো ...

- সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।

- এ আর এমন কি , বরং আজ আপনি আমার সঙ্গ দিয়ে আমাকে উপকৃত করলেন।এদিকের অবস্থা তো জানেন সব ।

তৃষা একটি মোড় এ এসে থামলো ।

-এদিকে এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান তারপর ডান হাতে স্কুল ছেড়ে কিছুটা গিয়ে ফাঁকা জমি পড়বে ,তারপরেই মাস্টারমশাই এর বাড়ি।

- চলুন আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দি।

- না না , তার দরকার নেই ।আমরা গ্রামে ঢুকে পড়েছি। গ্রামের ঘরগুলোর দালানে লন্ঠন জ্বলছে , এটুকু পথ আমি একাই যেতে পারবো।আপনি এগিয়ে যান।

ধ্রুব তৃষা কে আর একবার ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে গেলো।

তৃষা তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।আজ বড্ড দেরী হয়ে গেছে ।বাবার নদীতে মাছ ধরতে 

যেতেও দেরী হবে আজ, এসব চিন্তা মাথায় ঘুরছে। চিন্তার মাঝখানে ছেদ পড়লো, ধ্রুবর মুখটা মনে পড়লো ,গলাটা বেশ পুরুষালি ঠিক যেন জলপ্রপাত আছড়ে পড়ছে ।শহরের ছেলেরা ভীষন অহংকারী হয় কিন্তু ধ্রুবর মধ্যে ভদ্রতা আছে ।মুখের আদলে বুদ্ধিমত্তার ছাপ।তৃষা লজ্জা পেলো তার ভাবনায়,নিজের মনে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলো। কলেজের স্যারের কথা গুলো মনে পড়লো, বাস্তব মানুষকে ভীষণ কঠিন করে তোলে মাঝে মাঝে একথাটা যে কতটা সত্যি তা সে টের পেলো। এসব স্বপ্ন তার মানায় না ।

বৃষ্টি থেমে গেছে।একফালি চাঁদ উঠেছে মেঘের ফাঁক দিয়ে।শুধু মনের কোণটি ঘিরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরে অবিরাম।

 

ধ্রুব সকালে তাড়তাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়লো ।কাল রাতে স্যারের সাথে কথা হয়েছে আজকে অফিসার এর সাথে কি আলোচনা করবে ।সেই মত আটটা নাগাদ বেড়িয়ে পড়লো স্যার কে নিয়ে। ওরা একটি ছোটো নৌকা নিয়ে বি.এস.এফ. ক্যাম্পে পৌঁছলো । অফিসার ওদের দুজনকে চেয়ারে বসতে বললেন। ধ্রুব সমস্ত ব্যাপারটা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করলো । সুতপা ছাড়াও আসে পাশের আরও কয়েকটা গ্রামের অল্প বয়সী মেয়েদের মিসিং ডায়েরী নিয়েও খোঁজ খবর নিলো। কি কি স্টেপ নিয়েছে ফোর্স এব্যাপারে সে খবরাখবর নিলো। অফিসার কে ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা ফিরে এলো গ্রামের ঘাটে।স্যারকে বিদায় জানিয়ে ধ্রুব রওনা দিলো ।ঘাটের বট গাছটার দিকে নজর যেতেই কাল সন্ধ্যের কথা একঝলক উকিঁ দিলো মনে ।তৃষার মুখটা মনে পড়লো ।আর কি ওর সাথে দেখা হবে ! অদ্ভুত মন খারাপের চাদরে আকাশ ঢেকে গেল। 

যখন আখরিগঞ্জ এর ঘাটে পৌঁছলো তখন প্রায় বিকেল। একবার এখানকার থানার ওসি এর সাথেও কথা বলা দরকার । তাছাড়া এই গ্রাম গুলোতেও একটু খোঁজ খবর নিতে হবে , লোকাল পুলিশ পোস্ট গুলিতেও ঢুঁ মারতে হবে ।প্রচন্ড খিদেও পেয়েছে,কিন্তু এই সময় হোটেলে কি পাওয়া যাবে কে জানে। এইরকম গঞ্জের হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ ,তরকারি এসব পাওয়া যায় কিন্তু এই অবেলায় কি পাবে কে জানে ।শহরের মত রোল ,চাউমিন এসব তো এখন পাবেনা এখানে।এসব ভাবতে ভাবতে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলো হঠাৎ তৃষার মুখোমুখি হলো। 

ধ্রুব তাকিয়েই রইলো কথা আটকে গেল মুহূর্তের জন্য।তৃষা মনে মনে খুশী হলেও একটা কৃত্তিম অবাক ভাব ফুটিয়ে তুললো মুখমন্ডলে ।

বিহ্বল ভাব কাটিয়ে ধ্রুব হাসলো স্মিতভাবে ।

- কলেজ থেকে ফিরছেন ? 

- হ্যাঁ ,আপনার কাজ হলো ?

- হ্যাঁ, তবে এখানে কয়েকদিন যাতায়াত করতে হবে । কিছু কাজ বাকি আছে।

-ওহঃ,

-আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হল , আপনার ফোন নম্বরটা যদি দেন।

-কেন বলুন তো?

-না ,মানে ,এখানে আবার যখন আসবো তখন দরকার পড়লে আপনার সাহায্য নিতে পারি!আপনি তো এদিকের সব চেনেন।

ইস কি অদ্ভুত বাহানা দিলো !অন্য কিছু মনে এলোনা , উফফ কি করবে এখন সে ,মনে হয় ধরা পরে গেছে ।

তৃষা কি বলবে ভেবে পেলোনা , চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো ,এখন সবার হাতেই মোবাইল।কলেজের সব বন্ধুদের আছে । বান্ধবীদের সাথে দরকারে যোগাযোগ করতেও পারেনা কিন্তু সে কি করবে !ইতস্ততঃ ভাব কাটিয়ে সোজাসুজি উত্তর দিলো।

-আমার মোবাইল নেই!

-ওহ, 

ধ্রুব নিরাশ হল।

-আমি আসি,নৌকো ছাড়ছে ।তৃষা নৌকোর দিকে পা বাড়ালো। 

ধ্রুবর আরো কিছুক্ষণ তৃষার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু উপায় নেই। তৃষার চলে যাওয়ার দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকলো। আজ তৃষা হাল্কা গোলাপি রঙের চুড়িদার পড়েছে। গোলাপী -লাল, ধূসর গোধূলির আলোয় ভেসে যাচ্ছে ধ্রুব। কালকের মত আজও মন ছুটে যেতে চাইছে তৃষার সাথে খেয়ায় ভেসে ।জীবনের খেয়াতেও কি ভাসতে চাইছে তার মন !!

 

         পরবর্তী পর্ব (চতুর্থ) আগামী শনিবার ১৫/০৮/২০২৬ প্রকাশিত হবে।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ভিনদেশী তারা (পর্ব-২)
মন্দিরা পাল

ভিনদেশী তারা (পর্ব-২)

ঘাটে যখন নৌকা পৌঁছলো তখন সন্ধ্যে ৬টা বেজে গেছে ! চারিদিকে অন্ধকার , বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো অনেক আগে কিন্তু এখন বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

সাপ্তাহিক লেখালেখি১ আগস্ট, ২০২৬
ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
সুরজিৎ ব্যানার্জি

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)

কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

সাপ্তাহিক লেখালেখি১৩ জুন, ২০২৬
ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সুরজিৎ ব্যানার্জি

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)

সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"

সাপ্তাহিক লেখালেখি২৭ জুন, ২০২৬