
বিভাস মূর্খ, পকেটে টাকাপয়সা আছে, জামাটা ইস্ত্রি করা হয়নি, জামার কোথাও কোথাও হলুদ ছোপ ছোপ, তরকারি মেখে ওই অবস্থা হয়েছে হয়তো, হাফপ্যান্ট এবং একটি হাওয়াই চটি, গ্রীষ্মের সকাল সাড়ে দশটার সময় একটি মিষ্টির দোকানের বেঞ্চের উপর বসে আছে। কয়েকটা মাছি ছাড়া এই মুহূর্তে মিষ্টির দোকানটায় কেউ ঢুকছে না, আবার বেরোচ্ছেও না। কেউ যখন ঢুকছে না, তখন অবশ্যই কেউ বেরোচ্ছে না—এতে দোকানের মালিক বা বিভাস কেউই খুব একটা চিন্তিত নয়। দোকানের মালিক খবরের কাগজ পড়ছেন, একজন কর্মচারী দোকানের ভেতরের ঘরে মোবাইলে ওড়িয়া গান শুনছেন। রাস্তার উপর প্রচুর গাড়িঘোড়া, থেকে থেকেই যানজট হচ্ছে। মিষ্টির দোকানের পাশেই চায়ের দোকান, বিভাস ওখান থেকে একটি গ্লাসে কিছুটা লিকার চা নিয়ে এসে এই বেঞ্চটায় প্রতিদিন বসে। বাজারের এই দিকের অন্তত পাঁচ-সাতটা দোকান বিভাসদের পৈতৃক জমির উপর, কিন্তু কেউ আজকাল আর ভাড়া দেয় না। বিভাস গোবেচারা ধরনের মানুষ, লড়াই-ঝগড়া তো দূরে থাক, নিজের প্রাপ্য চাইতেও সে লজ্জা পায়। দোকানের মালিকেরা সবাই তা বুঝে গিয়েছে, তাই তারা বিভাসকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। তাদের দোকানগুলোতে বিভাস এসে সকাল, বিকেল, সন্ধে বসে; বিনামূল্যে তারা তাদের দোকানের জিনিসপত্র দু-একটা বিভাসকে খেতে দেয়।
এই তো আগের শীতে বিভাসের মা মারা গেল। বাবা মারা গিয়েছেন আটাশি সালে। বিভাস বিয়ে করেছিল, বউ ম্যালেরিয়া না ডেঙ্গু কিছু একটাতে মারা গেছে। এখন বিভাস একা। একা বলতে যা বোঝায়, সবটাই বিভাস। চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া বিভাস আজকাল আর কিছুই করে না। বিভাসদের তিনতলা বাড়ি, তিনটে তলাতেই সাতটি পরিবার থাকে ভাড়াটে। বিভাসের মা যতদিন বেঁচে ছিল, তারা ঠিকঠাক ভাড়া দিত। এখন কী করে তারা ভাড়া আদৌ দেয় কিনা, সেটা ঠিক বোঝা যায় না। বিভাস ছাদের উপর একটি চিলেকোঠার ঘরে থাকে। মা মারা যাবার পর তিনতলায় আরও দুটো ভাড়াটে বসিয়ে বিভাস ছাদের ঘরটায় গিয়ে উঠেছে। বিভাস জীবনের বেশিরভাগ সময়ে এই ছাদের ঘরেই কাটিয়েছে। কলেজ পাস করার পর ধর্মতলায় কী একটা চাকরি পেয়েছিল বিভাস। সেই অফিসেই একটি মেয়ের সাথে প্রেম ও বিয়ে। আমরা যারা পুরনো মানুষ, বিভাসের শিশুকাল, যৌবনকাল, শিশুপাল, পাল বংশ, যদুবংশ—এইসব খুব কাছ থেকে দেখেছি, তারা বলতে পারি বিভাস এরকম ছিল না। বিভাস মানুষটা কিরকম ছিল, তা আমাদের আজ আর কারও মনে নেই। এখন আধা পাগলের মতো চোখের মণিতে ছানি নিয়ে, সাদা পাকা দাড়ি নিয়ে বিভাস বসে থাকে।
মাঝেমধ্যে বিভাস মাসির বাড়ি যায়। বিভাসের মাসির বাড়ি তারকেশ্বর। মাসির কোন সন্তান নেই, বিভাসকে ছেলের মতো ভালবাসে। মা মারা যাওয়ার পর এই ভালবাসা যেন দ্বিগুণ হয়েছে। বিভাসের বাড়ির পেছনে বেশ অনেকটা জায়গা রয়েছে—ঝোপজঙ্গল এবং একটি সবুজ রঙের বিশাল পুকুর। বিভাসের বাবা ওই পুকুরে স্নান করতে নেমে ডুবে মারা যান। তারপর থেকে ওই পুকুরের নামে একটি বদনাম রটে যায়, কেউ আর ওই পুকুরের দিকে যায় না। জ্যোৎস্না রাতে বিভাস ছাদের উপর থেকে ওই পুকুরের দিকটায় তাকিয়ে থাকে। ভাবে, বাবা হয়তো মারা যাননি, একটু পরেই পরনে গামছা, দীর্ঘ ফর্সা মানুষটা নিজের সাদা পৈতে থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে আসবেন। কণ্ঠে অস্পষ্ট মন্ত্র, তারপর খালি গায়ে এগিয়ে যাবেন বিভাসদের ঠাকুরঘরের দিকে। বিভাস এরকম অনেক রাত্রি ছাদের উপর জেগে থাকে। সেইসব রাতেই নক্ষত্রেরা বিভাসকে ঘুমোতে যেতে বলে, ঠিক যেরকম বিভাসের বউ বেঁচে থাকতে বলতো। বিভাস আর কোন কিছুতেই কান পাতে না। কথা প্রায় বলাই ছেড়ে দিয়েছে। আসলে দীর্ঘ সময় চুপ থাকতে থাকতে কথা বলার শক্তি হয়তো হারিয়ে যায়। একাকিত্বের চাপে কণ্ঠস্বর সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে হতে, ভীষণ হাওয়ায় মোমবাতি যেরকম নিভে যায়, ঠিক সেভাবেই নেমে আসে গভীর নিস্তব্ধতা। বিভাস নিস্তব্ধতা নিজের অস্তিত্বের থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসে। বিভাসের পাঁচিলের ফাটলে একটি ধূসর প্যাঁচা বাসা বেঁধেছে। বিভাসের রাতের দিকে ওই প্যাঁচাটির ভ্রাম্যমাণ জীবন নিয়ে এক অনর্গল সংলাপ চর্চা করা অভ্যেসে পরিণত হয়েছে।
গ্রীষ্মের দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে। মিষ্টির দোকানের সেই মাছিগুলো একসময় উড়ে যায় ধুলো ওড়ানো পিচ রাস্তার ওপারে, কোনো এক ডাস্টবিনের দিকে। দোকানের ওড়িয়া গানটি কখন বন্ধ হয়ে গেছে। বিভাস এখনও বসে থাকে। তার চোখের মণির ছানি ভেদ করে এক অদ্ভুত ধূসর আলো চারদিকের জগতটাকে আরও ঝাপসা করে দেয়।
প্রতিদিনের মতো আবার রাত নেমে এসেছে বিভাসের জীবনে। আজকে জ্যোৎস্না প্রায় নেই বললেই চলে, সামনেই বোধহয় অমাবস্যা। বিভাস যথারীতি ছাদের পাঁচিলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে পুকুরের দিকে মুখ করে। বিভাসের প্যাঁচাটি কিছুক্ষণ ডেকে কোথাও একটা ডানা ঝাপটে উড়ে গেছে। হঠাৎ বিভাস শুনতে পেল, প্রচুর মানুষ কী যেন নিয়ে একটা কথা বলছে। এখন গভীর রাত, এত মানুষের জটলা কোথা থেকে হবে? শব্দগুলো খুব কাছ থেকে আসছে। ভাড়াটেরা যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। এত কথাবার্তার শব্দ কোথা থেকে আসছে, বিভাস মুখ ঘুরিয়ে তাকায় বোঝার জন্য। হ্যাঁ, অবশ্যই এগুলো সিঁড়ির কাছ থেকে আসছে। অনেক মানুষ একসাথে হইহই করে বিভাসের দিকেই এগিয়ে আসছে—যেভাবে ক্ষিপ্ত জনতা পকেটমারের দিকে ছুটে যায় এক-দু ঘা কিল বসিয়ে দেবে বলে। বিভাস হঠাৎ ভাবতে শুরু করে, সে কি কোনো অন্যায় করেছে কোথাও? মনে করে উঠতে পারে না নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে কিছু এরকম ঘটেছে কিনা। মানুষের শব্দগুলো আরও বিকট আকার নিচ্ছে এবং বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। অস্পষ্ট সেসব কণ্ঠস্বর শুনলে বোঝা যায়, মানুষগুলো ভীষণ রেগে রয়েছে। নিজেদের মধ্যে বলাকওয়া করছে এবং সেইসব কথাবার্তার কেন্দ্রে যে অবশ্যই বিভাস এবং তার কোনো একটি কর্মকাণ্ড জড়িয়ে রয়েছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
বিভাস ধীরে ধীরে অন্ধকার সিঁড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। এখনও শব্দটা পাওয়া যাচ্ছে, তবে অনেক জোরে সিঁড়ির শেষ দিকটা থেকে এই মানুষগুলোর শব্দ আসছে। এরপর পায়ের ধুপধাপ শব্দ সিঁড়ির উপর পড়তে লাগল। মানুষগুলো যেন নিজেদের রাগ আর ধরে রাখতে পারছে না, এগিয়ে আসছে অন্তত পঞ্চাশ-ষাট জন ছেলেমেয়ের দল। বিভাস অন্ধকারের মধ্যে মানুষগুলোকে দেখবার জন্য প্রথমে চোখ কুঞ্চিত করে, তারপর কিছুটা ঝুঁকে পড়ে দেখবার চেষ্টা করল। পায়ের শব্দ বেড়ে চলেছে, কিন্তু এতক্ষণেও একটি মানুষকেও দেখা গেল না। তারপর হঠাৎ একদমকা হাওয়া সিঁড়ির তলা থেকে ঠিক ঝড়ের মতো বিভাসের মুখে-চোখে এসে লাগল। কোনো কিছু বোঝার আগেই বিভাস কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। অদ্ভুত বিষয়, বিভাস স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছে। তার শরীরটা ছাদের উপর পড়ে আছে ঠিক সিঁড়ির মুখে, আর তার আত্মা শরীর ছেড়ে নেমে যাচ্ছে। বিভাস বুঝতে পারল, এই চলে যাওয়ার মধ্যে আসলে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বিভাস আরও অনুমান করতে পারল, সে চলেছে সেই পানাপুকুরটার দিকে। তবে কি সে আজ বাবাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছে?
বিভাস এতদিন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছে, বাবার আত্মা ওই পুকুরঘাট, জঙ্গল এবং বিভাসদের বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। বহুবার জ্যোৎস্নায় বিভাস দেখেছে তার বাবাকে—স্নান সেরে বৃদ্ধ মানুষটি খুব ধীর পায়ে উঠে আসছেন, তার শরীর থেকে জল ঝরে পড়ছে মাটিতে। সেই জল আসলে স্মৃতির স্তাবকতা করে। অসীম প্রবঞ্চনা নিয়ে বিভাসের বাবার চলার পথ, এবং সেই পথে কেউটে সাপের অর্থহীন জীবনযাপন অতীত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমানের মধ্যকার অনায়াস যাতায়াতকে প্রশ্রয় দেয়। মাঝে মাঝে রাতের দিকে শোনা যায় ইহকাল-পরকালের এক ঠান্ডা অট্টহাস্য, যা প্রায় প্রত্যেকটি একা মানুষ গভীর রাতে অবশ্যই শুনতে পায়।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"

অর্ঘ্য রায় চৌধুরীর দুটি কবিতা
সমস্ত উৎসব ফুরিয়ে গেছে বলেই সন্ধ্যা নেমে এল মেঠো পথ, বহুদূরে গাছেদের সারি বিকেলের আলোটুকু ম্লান এখন কোথায় যেতে পারো তুমি? অন্ধকারে হাতড়ে বেরিয়েছো চেনা পথ পুরোনো দরজায় কড়া নেড়ে দেখেছো বন্ধ হয়ে গেছে সমস্ত চিঠিদের চোখ এখন এক চোরাবালি জেগে উঠেছে ধূ ধূ চর, ওইপারে নিঃঝুম গ্রাম এইখান থেকে আজ ফিরে যেতে পারো।