শ্রাবণ সংখ্যা

জিকির
জানালার মুঠি থেকে জানালার ফুল খসে পড়ে এখন সকলের আলোয় রোজা মুখে বসে থাকি। সরকারি পাখিদের গান শুনি পুতুলের নিয়ন্ত্রিত খেলা শেষে—

শৌভিক দত্তের ৪টি কবিতা
ডালপালা কেটে যাওয়ার পর অখণ্ডতা আমার পরোয়া করে না। কোথাও দশদিক নেই। হাতের বালকে অরণ্য ফুরিয়ে আসে। এই অশক্ত শীতে ভুলে যাওয়া কোনও ডুবোজাহাজ খুলে সম্মোহণগন বেরিয়ে এসেছে। পদাতিক গণিতে রাখা ভীড়ের ছররা কিছু। পতাকাগলিতে।

শ্রাবণের কাব্য-ধারা
বর্ষার লাবণ্যময় পরিবেশে কবিহৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠেছে যুগে-যুগে। মায়াময় অলকাপুরীতে কবিমন বারবার ছুটে গেছে। কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতে’ পর্বতের ওপারে নির্বাসিত শূন্য ও একাকী জীবনে ‘মেঘ’কে দূত করে পাঠিয়েছেন প্রিয়ার কাছে। 'ও মেঘ, জানি আমি জাতকপত্রিকা, ভুবনবিখ্যাত পুষ্কর তোমার নাম জানি তোমার গুণপনা ইচ্ছামতো পারো উড়িতে প্রধান ইন্দ্রের ও মেঘ, প্রিয়া দূরে, তোমার কাছে তাই প্রার্থী- ক্ষতি কী গুণবানে বিফল হই যদি, অধমে গ্লানিময় যাচ্ঞা।' - মেঘদূত (পূর্বমেঘ), অনুবাদ- শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

চারটি কবিতা
ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছি বন, একটা টলটলে পুকুর, আর তিনটা হাঁস। শৈশবে আমি ভাবতাম একটা প্রজাপতির ভেতর হলুদ ডানার বিস্তার ছাড়া আর কিছু নেই। ভাবতাম প্রজাপতির জন্ম রাইখেতে। এখনো তাইই ভাবি। প্রজাপতি মন্ত্র পড়বার পর একবার মনে হল ভুলে যাই শৈশব। কিন্তু মানুষ এমনই বিপন্ন প্রাণী, শৈশব ছাড়া সবকিছুই ভুলে যায়। যাদের অ্যালঝাইমার হয় তাদেরও শৈশব মনে থাকে শেষের আগ পর্যন্ত। আর যখন শৈশবও ভুলে যায় তখন তারা শিশু হয়ে যায়। আর ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে রাখে বুড়ো আঙুলের নখ, যদি নখের আয়নায় আলো লেগে দৃশ্যমান হয় ফুরিয়ে যাওয়া জীবনের ঘ্রাণ।

গো বি ন্দ চ ক্র ব র্তী র কয়েকটি কবিতা
আমার মেয়ে নীল প্রজাপতির পাখায় এঁকে দেয় একটি সকাল

নুরুল হাসানের দুটি কবিতা
তুমি ভালোবাসলে কি ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি ধার্মিকরা হঠাৎ করে মানুষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত শাসকের শোষণ-প্রবৃত্তি? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত পাহাড়-জঙ্গল চুরি? জানি না! তুমি ভালোবাসলে কী হত।

স্পর্শময়ী
তুমি এসে আচানক স্পর্শ দিলে ঠোঁট প্রদেশে, দেহ মানচিত্রের অলিতে-গলিতে...! তারপর ঝড় বইলো পা থেকে মাথা অবধি। প্রতিটি রোমকূপের গোড়ায়, শিরা-উপশিরায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্পর্শের নান্দনিক ছোঁয়ায় যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অদাহ্য আগুনের লেলিহান শিখা পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে লবণ সমুদ্রে ডুব দিলাম... ডুব দিতেই থাকলাম... দিতেই থাকলাম!

দুটি কবিতা
দুপুরের বিপরীত মেঘের হুইসেল বেজেছে আজ স্মৃতি জমেছে—পাখি ও প্রার্থনার মতো। নিঃসঙ্গ কেবিন আর শাদা আলোর ভেতরে নিয়তির অন্ধকার ঘন হয়ে এলো আরও কোথাও জীবন অবমাননা করেছে নিজেকে।

আমেনা দুধেরও বাছা
তরমুজ ব্যবসায়ী হারুনের সাথে যখন আমেনার বিয়ে হয়, সেই বছরের মাঘ মাসের শীতে আলেয়ার আলো খুব দেখা যাচ্ছিল। দূরে তাল,নিম আর শিরিষগাছের ফাঁক দিয়ে আলেয়ার আলো নিভু নিভু—কেঁপে কেঁপে সম্ভ্রমে লজ্জায় হেঁটে উধাও হয়ে যেত। মনে হত কেউ মধ্যরাতে চার্জহীন টর্চ লাইটটাকে থাপড়াতে থাপড়াতে ; পেটের ভুটভাট অত্যাচার থামাতে পায়খানার দিকে যাচ্ছে।

আত্মমৈথুনিক স্বভাবে
অথচ এই ঘনানো অন্ধকার হয়তোবা থেকে যাবে রয়েছে তো সুদীর্ঘকাল ফুল হয়ে হয়তোবা গেলাসের জলে স্ফূর্তি ও সঙ্গম বিলাপের বন্দিশ আরবার

সমরজিৎ সিংহের কয়েকটি কবিতা
পড়বে না আমার কবিতা ? তাতে কিছু হবে ? কথা ছিল আমার লেখার । ভাবিনি, পড়বে ।

আমাদের যুদ্ধ জারি থাকবে
আগুন আগুন আগুন জ্বলছে আমাদের বুকে-পেটে-মাথায় শ্রাবণের ফোঁটাগুলো যেন এক একটা পেরেক অন্ধ করে দিচ্ছে আমাদের চোখ আমাদের স্বপ্নগুলোকে খোরাক বানিয়ে হাসাহাসি করছে

অপরাহ্নের পর
কিছু দুপুর আছে, বিকেলের আগেই শেষ হয়ে যায়। জানালার পাশে বসে টের পাই। রোদটা ধীরে ধীরে দেয়াল বেয়ে ওঠে, তারপর হারিয়ে যায়। ওই সময় কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না। বই খুলে বসি, দুই পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর খেয়াল করি দশ মিনিট ধরে একই লাইনের দিকে তাকায়ে আছি। শব্দগুলো চোখে ঢুকছে, মাথায় ঢুকছে না। অভিমান করেছে ভাষা। অমন সময় শহরের পুরনো জায়গাগুলাতে ফিরতে ভাল লাগে। নতুন ক্যাফে, নতুন রেস্টুরেন্ট, নতুন সাজসজ্জা খুব একটা টানে না। সেই চায়ের দোকানে যাই, যার বেঞ্চিটার একপাশ একটু নিচু। সেই বইয়ের দোকানে ঢুকি, যেখানে মালিক এখনো প্রতিবার জিজ্ঞেস করে, নতুন কবিতার বই লাগবে?

সুজাতা
শুধু আমাকেই বলা হল কথা বলতে শুধু আমাকেই বলা হয় লোনা জলে স্নান করে এসো আমারই কপালে সিঁদুর গলায় মালা,কাপালিকের কাছে যাও দেবতার পূজা আমারই অধিকার,শব্দ ধূপ ধূনা নিয়ে বসো

শবমুখ এমন
শবমুখ আমার দিকে এমন তাকিয়েছিল শোকযাত্রার মাঝখানে যে তৎক্ষণাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীতার উচ্চকিত খেলায় না নেমে বাড়ি ফিরে এলাম আমি। বাড়ি না ফিরে কী করা যেত? মেঠোপথে ঘাস, শিশিরভেজা, জড়ানো আলোর তন্তুজালে।

ঘুড়ি কেটে গেলে
কতটা দূরে গেলে তাকে বিচ্ছেদ বলি আবহমান কাল থেকে খসে বৈচিত্র্য শহর নামক খাঁচায় গচ্ছিত জীবনে শুধু দৌড়ঝাঁপ এদিক থেকে ওদিকে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে রহস্যময় ঘনঘটা মেঘ

কবিতারা
আলো দেখা হেরে গেল আলো জ্বালানোর কাছে হেরো আলো আর বিজয়ী আগুন আমার সঙ্গেই থাকে মাথা কোটে মাথা কাটে

রহিত ঘোষালের দুটি কবিতা
রোয়াকে রোদ্দুর, অপরিসীম বিকেল, শ্যামাঙ্গিনী আকাশ, কাঁটাজঙ্গল, ভাগচাষিদের ঘর, ঘরের ক্রন্দনধ্বনি— এই সারাংশ। কাদাজমি থেকে উঠে আসে ঘরগেরস্থি, বুকের শিলাস্তরে ফাটল ধরে— সম্পর্কের পর্বতমালা রমণ চায়, লঞ্চ চলে যায় সাঁঝবেলায় কথার হবিষ্যি আর ছাড়পত্র নিয়ে,

শাশ্বত ভট্টাচার্য্যের কয়েকটি কবিতা
স্টেশন পাড়ার মোড়ে ট্রেন থেকে দেখতে দেখতে জাম রঙের সন্ধ্যা দক্ষিণের দুয়ারে নেমে এলে , পাঁচটি চিল মেঘ হয়ে যায় দুয়ারে সারমেয়টা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাই তুলছে, তুমি এলে উষ্ণতা পাবে খড়কুটো....

জীবনের আসল পরিচয়
যখন ভেঙে পড়ে ভাগ্যের সব আশ্রয়, তখন মেলে জীবনের আসল পরিচয়। অবলম্বন সকলই হয়ে পড়ে শিথিল, অভিমানের কৃষ্ণগহ্বরে সম্পর্ক হয় বিলীন।

অস্তরাগ
আকাশে ফুলকি ছোটে উপাসনা গৃহে কান পাতে দু’টি বুড়ো কাক সেদিনও যে রাস্তা চলেছে নদীর গানে সেখানে ঢেলে গেছে কেউ ধুলো ভরা ফুসফুসের অস্তরাগ